Posts

খোকা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস…

১৯৪০ সাল। তখনও ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়নি। চারদিকে ব্রিটিশ সরকারের কঠোর শাসন। গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনে সুখ বলতে কিছু ছিল না। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে ভয়। দিনের আলোতেও মানুষ নিচু গলায় কথা বলত, আর রাত নামলে চারপাশে নেমে আসত এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকত আতঙ্ক, অজানা ভবিষ্যৎ আর স্বাধীনতার জন্য জমে থাকা রাগ। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলো তখনও শহরের খবর পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারত না। কিন্তু বাতাসে একটা পরিবর্তনের গন্ধ ছিল। কোথাও গোপনে আন্দোলন চলছে, কোথাও যুবকেরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে, আবার কোথাও মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে। এই গল্প সেই সময়ের। এক কিশোরের গল্প। এক মায়ের অপেক্ষার গল্প। আর স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া হাজারো অজানা মানুষের গল্প। বাংলার এক ছোট্ট গ্রাম—নলডাঙ্গা। চারদিকে ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, কাঁচা রাস্তা আর দূরে একটা ছোট নদী। গ্রামের মানুষ খুব সাধারণ জীবন যাপন করত। সকালে মাঠে যাওয়া, দুপুরে রোদে কাজ করা আর সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় বসে গল্প করা—এই ছিল তাদের পৃথিবী। এই গ্রামেই বাস করত এক কিশোর—বিনয়। তার বয়স তখন মাত্র সত...

দীপান্বিতা—একজন ডাক্তার, এক প্রেমিকা এবং এক অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প

Image
কিছু চরিত্র গল্পের পাতায় আসে, গল্পের প্রয়োজনে নিজের ভূমিকা শেষ করে চলে যায়। আবার কিছু চরিত্র আছে, যারা গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পাঠকের মনে থেকে যায়। তাদের নিয়ে ভাবতে গেলে শুধু ভালো-মন্দের হিসাব করা যায় না। তাদের সিদ্ধান্তকে বিচার করতে গেলে বারবার মনে হয়—মানুষ কি সত্যিই সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে? ‘তুমি ডানা মেলো’ উপন্যাসের ডঃ দীপান্বিতা ঠিক তেমনই একটি চরিত্র। তিনি একজন চিকিৎসক। দায়িত্ববান, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, নিজের পেশা নিয়ে সচেতন এবং জীবনের প্রতি যথেষ্ট বাস্তববাদী। হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোরে তাঁকে প্রথম দেখা যায় একজন পেশাদার চিকিৎসক হিসেবেই—কাঁধে স্টেথোস্কোপ, হাতে রোগীর ফাইল, চোখে ক্লান্তি। কিন্তু সেই কঠিন পেশাদার আবরণের আড়ালে যে একজন অত্যন্ত অনুভূতিশীল মানুষ লুকিয়ে আছে, গল্প এগোতে এগোতে সেটাই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। দীপান্বিতার চরিত্রের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো তাঁর মায়াবী চোখ এবং তীক্ষ্ণ অনুভূতিশীলতা । সাগরের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় কোনো সিনেমার মতো সাজানো মুহূর্তে নয়। হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোরে একটি পড়ে যাওয়া ফাইল তুলে দেওয়ার মতো সামান্য একটি ঘটনায় তাঁদের পরিচয়। সা...

১৪ বছরের একটি শিশুকে মৃত্যুদণ্ড—George Stinney Jr.-এর মর্মান্তিক গল্প

Image
কখনও কখনও ইতিহাসের কিছু ঘটনা এতটাই নির্মম যে সেগুলোকে শুধু একটি পুরোনো মামলা বলে মনে হয় না। মনে হয়, সময়ের একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মানুষ, সমাজ, আইন আর বিবেক—সবকিছুকে একসঙ্গে প্রশ্ন করা হচ্ছে। George Junius Stinney Jr.-এর গল্প তেমনই এক ঘটনা। ১৯৪৪ সালে আমেরিকার South Carolina অঙ্গরাজ্যের একটি ছোট শহরে মাত্র ১৪ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে দুটি শ্বেতাঙ্গ কিশোরীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার বিচার হয়, অল্প সময়ের মধ্যে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং গ্রেফতারের প্রায় তিন মাসের মধ্যেই তাকে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তখন George-এর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, তার মৃত্যুর প্রায় ৭০ বছর পরে আদালত স্বীকার করে যে সেই বিচারে তার সাংবিধানিক অধিকার গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল। George Stinney Jr.—১৯৪৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া কিশোর। ১৯৪৪ সালের মার্চ মাস। South Carolina-র Alcolu নামের একটি ছোট mill town-এ George Stinney তার বাবা-মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে থাকত। সে ছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সেই সময় আমেরিকার...

Sagar: একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ ভালোবাসার গল্প

Image
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে। কিন্তু চলে যাওয়ার পরেও তাদের রেখে যাওয়া অনুভূতিগুলো থেকে যায় অনেকদিন। কখনও কোনো কথা মনে পড়ে, কখনও কোনো দৃশ্য, আবার কখনও কোনো চরিত্র বারবার মনে প্রশ্ন জাগায়—“মানুষটা কি সত্যিই এমন হতে পারে?” আমার উপন্যাস তুমি ডানা মেলো -এর Sagar ঠিক তেমনই একটি চরিত্র। Sagar কোনো ধনী পরিবারের ছেলে নয়, কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক নয়, কোনো অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারীও নয়। সে একজন সাধারণ Medical Representative। তার প্রতিদিনের জীবন হাসপাতালের করিডোর, ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করা, নিজের কাজের দায়িত্ব আর দিনের শেষে একাকী একটি ছোট্ট ঘরে ফিরে আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই সাধারণ মানুষটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি বিশাল পৃথিবী—যেখানে আছে স্বপ্ন, অভিমান, আত্মসম্মান, একাকীত্ব এবং ভালোবাসা। Sagar-এর পৃথিবী Sagar-এর জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। তার কোনো বড় দাবি নেই। জীবনের কাছে তার চাওয়াগুলোও খুব বেশি নয়। নিজের কাজটা ভালোভাবে করা, নিজের জায়গাটা তৈরি করা এবং নিজের স্বপ্নগুলোকে একদিন সত্যি করে তোলা—এই নিয়েই তার পথচলা। কিন্তু একাকী মানুষের জীবনে সবচেয়ে ব...

আমি কবি ন‌ই, আমি একজন লেখক

কেউ যখন আমাকে বলেন, “আপনি তো কবি!”, তখন প্রথমে একটু থমকে যাই। তারপর হেসে বলি, “না, আমি কবি নই।” উত্তরে অনেক সময় আবার প্রশ্ন আসে, “কিন্তু আপনি তো লেখেন! তাহলে কবি নন কেন?” এখানেই আসলে একটা ছোট্ট ভুল ধারণা লুকিয়ে আছে—যে লিখলেই কবি, আর যিনি বই লেখেন তিনিই হয়তো কবি। অথচ লেখালেখির জগৎটা এতটা সরল নয়। একজন মানুষ লিখতে পারেন, কিন্তু তিনি কী লিখছেন, কীভাবে লিখছেন এবং কোন ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি করছেন—তার ওপরই নির্ভর করে তিনি কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক নাকি অন্য কোনো পরিচয়ে পরিচিত হবেন। কবি মূলত কবিতা লেখেন। কবিতার নিজস্ব একটি ভাষা আছে, নিজস্ব ছন্দ আছে, কখনও তা ছন্দোবদ্ধ, কখনও মুক্তছন্দ; কখনও কয়েকটি লাইনের মধ্যেই একটি সম্পূর্ণ অনুভূতি, দৃশ্য বা দর্শনকে ধরে ফেলে। কবিতায় শব্দের ব্যবহার অনেক সময় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, প্রতীকী এবং অনুভূতিনির্ভর হয়। একটি কবিতা হয়তো কয়েকটি লাইনের, কিন্তু সেই কয়েকটি লাইন পাঠকের মনে দীর্ঘ সময় ধরে একটা ছবি তৈরি করে যেতে পারে। একজন কবির প্রধান সাহিত্যিক পরিচয় তাই তাঁর কবিতা দিয়ে। অন্যদিকে গল্পকার গল্প লেখেন। গল্পের প্রয়োজন চরিত্র, ঘটনা, পরিবেশ, সংঘাত, সময় এবং সেই ঘটনাগু...

El Dorado, স্বর্ণলঙ্কা এবং পাতাললোকের রহস্য

  এল ডোরাডো। একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় স্বর্ণনগরীর কিংবদন্তি। শত শত বছর ধরে মানুষ বিশ্বাস করেছে, দক্ষিণ আমেরিকার গভীর জঙ্গলের কোথাও লুকিয়ে রয়েছে এমন এক নগরী, যার প্রাসাদ, মন্দির, রাস্তা—সবকিছুই সোনায় মোড়া। সেই শহরের সম্পদের কোনো সীমা নেই। আর সেই অমূল্য সম্পদের সন্ধানেই একের পর এক অভিযাত্রী পাড়ি জমিয়েছিলেন অজানা জঙ্গল, পাহাড় আর নদী পেরিয়ে। কিন্তু হাজারো অনুসন্ধান, অসংখ্য অভিযান আর অগণিত প্রাণহানির পরেও এল ডোরাডোর দেখা মেলেনি। যেন শহরটি ছিল, কিন্তু পৃথিবীর চোখের আড়ালেই থেকে গিয়েছিল তার অস্তিত্ব। কিন্তু যদি প্রশ্নটা একটু অন্যভাবে করা হয়? যদি এল ডোরাডো কখনো দক্ষিণ আমেরিকাতেই না থেকে থাকে? যদি বহু শতাব্দী ধরে যে স্বর্ণনগরীর খোঁজ মানুষ করেছে, তার গল্পের শিকড় লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে—প্রাচীন ভারতের কোনো বিস্মৃত উপাখ্যানে? ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা দক্ষিণ আমেরিকার অজানা ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে শুরু করেছিলেন একটি রহস্যময় স্বর্ণনগরীর সন্ধানে। সেই শহরের নাম হয়ে উঠেছিল—এল ডোরাডো। কথিত ছিল, সেখানে সোনা এতটাই প্রচুর ছিল যে সম্পদের মূল্যই যেন হা...

ধনী কে, গরিবই বা কে? — টাকার বাইরে জীবনের আসল হিসাব

  আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনে থাকি — “গরিবের বাড়িতে এসেছো, ভালো-মন্দ খেয়ে যেও।” অথবা, “গরিবের বাড়ি যাবে, দুটো ডাল-ভাত খেয়ে আসবে।” কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই “গরিবের বাড়ি” গিয়ে দেখা যায় বড় বড় মাছের পিস, পাঁঠার মাংস, পাঁচ রকম ভাজা, মিষ্টি—সবকিছুর আয়োজন করা হয়েছে। তখন মনে প্রশ্ন জাগে— এরা যদি গরিব হয়, তাহলে সত্যিকারের গরিব কাকে বলে? আসলে “গরিব” আর “ধনী” শব্দ দুটো আমরা এত সহজভাবে ব্যবহার করি যে, কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখি না এই শব্দগুলোর আসল মানে কী। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে— যার কাছে টাকা কম, সে গরিব। আর যার কাছে টাকা বেশি, সে ধনী। কিন্তু সত্যিই কি বিষয়টা এতটা সহজ? আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়— “ঠিক কত টাকা থাকলে একজন মানুষকে ধনী বলা যাবে?” তাহলে হয়তো কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। কারণ ধনী বা গরিব হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক নেই। কারো কাছে ১০ হাজার টাকাই অনেক বড় ব্যাপার, আবার কারো কাছে ১০ লাখ টাকাও খুব সামান্য। টাকার পরিমাণ নয়, মানুষের চাহিদাই ঠিক করে দেয় সে ধনী না গরিব আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে। সবাই আরও বেশি চায়। আরও টাকা, আরও বড় বা...