রি রি রি… | এক ঝড়ের রাতের বিভীষিকা | Story by Tanmoy Roy

 রাতটা যেন শেষই হতে চাইছিল না।

সন্ধ্যার পর থেকেই আকাশের চেহারা বদলে গিয়েছিল। পশ্চিম দিকের পাহাড়ের মাথায় জমে ওঠা কালো মেঘ ধীরে ধীরে পুরো আকাশটাকে গ্রাস করে নিয়েছিল, তারপর শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। প্রথমে টিপটিপ, তারপর ঝমঝম, আর গভীর রাত নামার আগেই সেই বৃষ্টি রূপ নেয় এক উন্মত্ত তাণ্ডবে। মনে হচ্ছিল, আকাশের বুক কোথাও ফেটে গেছে, আর সেই ফাটল দিয়ে অবিরাম জল নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি অন্ধকারকে ছিঁড়ে ফেলছিল, আর তার পরপরই এমন বজ্রধ্বনি শোনা যাচ্ছিল যে পাহাড়পুর গ্রামের পুরোনো টিনের ছাউনি, বাঁশের বেড়া, এমনকি দূরের পাহাড় পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠছিল।

সেই তুমুল বর্ষণের মধ্যেই কেটেছিল রাত।

ভোরের দিকে বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমতেই নমিতার ঘুম ভাঙল। জানলার কাঠের পাল্লা আধখোলা ছিল। বাইরে তাকাতেই ভেজা পৃথিবীর এক বিষণ্ন ছবি চোখে পড়ল। উঠোনজুড়ে কাদা, কলাগাছের পাতায় জমে থাকা জলের ফোঁটা, বাঁশঝাড় থেকে টুপটাপ ঝরে পড়া বৃষ্টির জল, আর দূরের পাহাড়গুলো কুয়াশা আর মেঘের পাতলা আস্তরণে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। আকাশ এখনও মেঘলা, তবে রাতের সেই উন্মত্ততা নেই। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, হয়তো আজ দিনটা খুব একটা খারাপ যাবে না।

ভাবনাটা যতটা আশাব্যঞ্জক ছিল, বাস্তবতা ততটাই কঠিন।

সময় নষ্ট করার অবকাশ তার ছিল না। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাকে সকালেই পৌঁছতে হয়। মাসের শেষে যে সামান্য বেতন হাতে আসে, সেই টাকাতেই কোনো মতে সংসারের চাকা ঘোরে। তার উপর রয়েছে দুটো টিউশনি। দিনের প্রতিটি ঘণ্টা যেন তার কাছে হিসেব করে খরচ করার মতো।

পুরোনো কাঠের আলমারির দরজা খুলে যত্ন করে ধোয়া একটি শাড়ি বের করল সে। শাড়িটা নতুন নয়, কিন্তু পরিষ্কার। নিজের জিনিসপত্রের প্রতি অদ্ভুত একটা যত্ন ছিল নমিতার। অভাবের সংসারে মানুষ হয়েও সে কখনও অগোছালো হতে শেখেনি।

রান্নাঘরের মাটির উনুনে আগের রাতের ভাত আর ডাল গরম করে একটি থালায় সাজিয়ে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে ভেতরের ঘরে ঢুকতেই মায়ের শুকনো কাশির শব্দ কানে এল।

চারুবালা দেবী বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাঁর শরীরকে ভেঙে দিয়েছে। চোখের নিচে গভীর কালি, মুখে বয়সের অসংখ্য ভাঁজ, অথচ মেয়েকে দেখলেই সেই ক্লান্ত চোখ দুটোয় মমতার আলো ফুটে ওঠে।

তিনি কষ্টে হেসে বললেন,
— "এত বৃষ্টির মধ্যে আজ না গেলেই হতো, মা।"

নমিতা মায়ের পাশে বসে তাঁর কাঁধে আলতো হাত রাখল। ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটলেও চোখের গভীরে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

— "না গেলে চলবে কী করে? মাসের শেষে টাকা না পেলে আমাদের চলবে কীভাবে?"

চারুবালা দেবী আর কিছু বললেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসের ভেতর ছিল বহু বছরের ক্লান্তি, অসহায়তা আর একমাত্র মেয়ের জন্য নিরন্তর উদ্বেগ।

নমিতার বাবা মারা গেছেন প্রায় পাঁচ বছর আগে। আচমকা হার্ট অ্যাটাকে মানুষটা চলে যাওয়ার পর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে তখনকার কলেজপড়ুয়া নমিতার কাঁধে। পড়াশোনা শেষ করে খুব কষ্টে এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিটা জোগাড় করেছিল সে। তারপর থেকে প্রতিটি দিন যেন এক অবিরাম সংগ্রামের নাম।

বাড়ি থেকে বেরোতেই আবার হালকা বৃষ্টি শুরু হলো।

ছাতাটা খুলে মাথার ওপর ধরতেই ঝোড়ো হাওয়ায় সেটি প্রায় উল্টে যেতে চাইল। দুই হাতে শক্ত করে ধরে কোনো রকমে এগোতে লাগল নমিতা। কাঁচা রাস্তা বৃষ্টির জলে পিচ্ছিল হয়ে গেছে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও ছোট ছোট জলাবদ্ধতা। গ্রামের মানুষজন খুব কমই বেরিয়েছে আজ। দূরে দু-একজন কৃষক মাথায় গামছা চাপা দিয়ে মাঠের দিক থেকে ফিরছিল।

ত্রিপুরার সীমান্তঘেঁষা পাহাড়পুর গ্রামটা এমনিতেই নির্জন। চারদিকে পাহাড়, ঘন সবুজ বন, মাঝখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটি বাড়ি। বর্ষাকালে এই নির্জনতা যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। আকাশ, পাহাড় আর জঙ্গলের মিলেমিশে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত নীরবতা মানুষকে অকারণেই অস্বস্তিতে ফেলে।

স্কুলে পৌঁছতে পৌঁছতে নমিতার শাড়ির নিচের অংশ কাদায় ভিজে গেছে।

আজ ছাত্রছাত্রীও এসেছে হাতে গোনা। বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের বাড়িতেই রেখে দিয়েছেন। শিক্ষকদের মধ্যেও কয়েকজন অনুপস্থিত। তবু নিয়মমতো ক্লাস শুরু হলো।

নমিতা বাংলা পড়াচ্ছিল।

ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনটা কিছুটা হালকা হয়ে এলো। ওদের সরল প্রশ্ন, নিষ্পাপ হাসি—সবকিছুই যেন জীবনের ক্লান্তি কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেয়।

কিন্তু আজ অদ্ভুতভাবে মন বসছিল না।

জানলার ওপারে বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল। কালো মেঘ আবার জমতে শুরু করেছে। বাতাসের শব্দও যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই প্রথম বেঞ্চে বসা এক ছোট্ট ছেলে হাত তুলে জিজ্ঞেস করল,

— "দিদিমণি, আজ আবার খুব ঝড় হবে?"

প্রশ্নটা শুনে নমিতা হেসে ফেলল।

— "না রে, এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"

কথাটা বললেও নিজের বুকের ভেতর যেন অকারণ একটা শীতলতা নেমে এলো।

কেন এমন হচ্ছে, সে নিজেও বুঝতে পারল না।

স্কুল ছুটি হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল।

এরপর টানা দুটো টিউশনি। বৃষ্টি থাকলেও আজ কামাই করার উপায় নেই। মাসের শেষে এই অতিরিক্ত টাকাটুকুই সংসারে একটু স্বস্তি এনে দেয়।

টিউশনি শেষ করে বাইরে বেরোতেই সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

আকাশের রং আরও গাঢ় হয়েছে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশেছে ঝড়ের আগাম বার্তা। গ্রামের কয়েকজন লোককে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে উত্তেজিতভাবে কথা বলতে দেখে নমিতা এগিয়ে গেল।

তাদের মুখে খবরটা শুনে তার বুক ধক করে উঠল।

সামনের প্রধান রাস্তা পুরোপুরি জলের তলায় চলে গেছে।

সেই পথ দিয়ে আজ আর বাড়ি ফেরা সম্ভব নয়।

একজন বলল,
— "বাঁদিকের পুরোনো রাস্তা দিয়ে গেলে পৌঁছতে পারবি, কিন্তু সাবধানে যাস। সন্ধ্যার পরে ওদিকে কেউ যায় না।"

নমিতা একবার দূরের কালো আকাশের দিকে তাকাল।

তারপর নিঃশব্দে হাঁটা শুরু করল।

বাঁদিকের সেই পুরোনো রাস্তা দিয়ে সে বহু বছর যায়নি।

রাস্তার দুপাশে বিশাল ফাঁকা মাঠ, কোথাও কোমরসমান ঝোপ, কোথাও অন্ধকারে ঢেকে থাকা পুরোনো বট আর শিমুলগাছ। মানুষের বাড়িঘর প্রায় নেই বললেই চলে। দিনের বেলাতেও পথটা নির্জন, আর সন্ধ্যা নামার পর যেন পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

কাদায় পা ফেললেই চপচপ শব্দ উঠছে।

দূরে কোথাও একটানা ব্যাঙ ডাকছে।

আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে মাঝেমধ্যে, আর সেই ক্ষণিক আলোয় চারপাশের নিস্তব্ধ মাঠগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন অচেনা কোনো পৃথিবীতে এসে পড়েছে সে...

মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু কাঁচা পথটায় পা ফেলতে ফেলতে নমিতার মনে হচ্ছিল, আজ যেন সময়ও অদ্ভুতভাবে ধীর হয়ে গেছে। পথটা সে আগে বহুবার দেখেছে, কিন্তু এতটা নির্জন, এতটা নিঃসঙ্গ কখনও মনে হয়নি। চারদিকে এমন এক নীরবতা নেমে এসেছিল, যার মধ্যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। শুধু দূরে কোথাও একটানা ব্যাঙের ডাক আর বাতাসে দুলতে থাকা ঝোপঝাড়ের মৃদু খসখস শব্দ সেই নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছিল।

হাঁটতে হাঁটতে সে কয়েকবার পিছন ফিরে তাকাল। কাউকে দেখা গেল না। তবু মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য কোনো দৃষ্টি যেন একটানা তার পিঠের ওপর স্থির হয়ে আছে। মানুষ মাঝে মাঝে অকারণেই এমন অনুভব করে—নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু যুক্তি যতই সামনে আসুক, মনের গভীরে জন্ম নেওয়া সেই অস্বস্তি কিছুতেই কাটল না।

কিছুদূর এগোতেই বাতাসের গতি আচমকা বেড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে কালো মেঘ আবার আকাশের শেষ আলোটুকুও গিলে ফেলল। তারপর যেন কোনো অদৃশ্য সংকেত পেয়েই শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শাড়ি, চুল, শরীর—সব ভিজে একাকার। ছাতাটা ঝোড়ো হাওয়ায় প্রায় উল্টে গেল। আর সেটাকে সামলানোর চেষ্টা না করে নমিতা দৌড়াতে শুরু করল।

কিছুদূর গিয়ে বিদ্যুতের ঝলকে সে দেখতে পেল মাঠের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ি। একতলা, ছোট্ট, শ্যাওলাধরা দেয়াল, ভাঙাচোরা ছাদ, চারপাশে বিশাল কয়েকটি পুরোনো গাছ। বাড়িটা যেন বহু বছর ধরে মানুষের স্পর্শ পায়নি। অন্ধকারের মধ্যে সেটাকে দেখে অজানা এক ভয় বুকের মধ্যে কাঁপন তুললেও আর কোনো উপায় ছিল না। ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানে নিশ্চিত অসুস্থ হয়ে পড়া।

সে দৌড়ে বারান্দায় উঠে দাঁড়াল।

টিনের ভাঙা কার্নিশ বেয়ে জল টুপটুপ করে পড়ছে। ভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে পুরোনো কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের এক তীব্র গন্ধ। সামনে বন্ধ দরজা, দুপাশে ভাঙা জানালা। চারদিক এতটাই নিঃশব্দ যে মনে হচ্ছিল, এই বাড়িটা যেন জীবন্ত—কেবল নিঃশ্বাস নিচ্ছে না।

সময় কতটা কেটে গেল, সে বুঝতে পারল না। বৃষ্টির কোনো লক্ষণই কমছিল না। ঠিক তখনই ভেতর থেকে ভেসে এল কর্কশ, কাঁপা একটি গলা—

“কে... কে ওখানে...?”

চমকে উঠল নমিতা।

ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন। সাদা শাড়ি, কুঁজো শরীর, মুখজুড়ে অসংখ্য বলিরেখা, সম্পূর্ণ সাদা চুল। কিন্তু সবচেয়ে অস্বস্তিকর ছিল তাঁর চোখ। অদ্ভুত স্থির, অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, যেন মানুষের চোখ নয়—অন্ধকারে জ্বলতে থাকা দুটি নিস্তেজ প্রদীপ।

নমিতা নিজের পরিচয় দিল। বলল, বৃষ্টি থামলেই চলে যাবে।

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন,

“ভেতরে এসো মা। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে জ্বর হবে।”

কী এক অজানা দ্বিধা তাকে আটকে দিতে চাইছিল। কিন্তু এমন অবস্থায় একজন বৃদ্ধার অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়াও সম্ভব হলো না। সে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠল। বহু বছরের ধুলো জমে আছে কাঠের আলমারি, টেবিল আর চেয়ারে। দেওয়ালের চুন খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও ফাটলের ভেতর শ্যাওলা জন্মেছে। এক কোণে কেরোসিনের বাতির হলদে আলো জ্বলছে, আর সেই আলোয় ঘরের ছায়াগুলোকে অস্বাভাবিক বড় বড় লাগছিল।

বৃদ্ধা এক গ্লাস জল এনে দিলেন। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসায় নমিতার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। সে জলটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করল।

জল খাওয়ার সময়ও সে লক্ষ্য করছিল, বৃদ্ধা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সেই দৃষ্টিতে আতিথেয়তার উষ্ণতার চেয়ে যেন অন্য কিছু বেশি—কৌতূহল, অপেক্ষা... কিংবা আরও ভয়ংকর কিছু।

রাত নেমে এলো।

বাইরে ঝড়ের শব্দ আরও ঘন হয়ে উঠল। বিদ্যুতের ঝলকানিতে মাঝে মাঝে পুরো ঘর আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল।

বৃদ্ধা খুব সামান্য ভাত আর আলুভর্তা খেতে দিলেন। খাওয়ার সময় প্রায় কোনো কথাই বললেন না। শুধু মাঝেমধ্যে অদ্ভুতভাবে হাসছিলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না; ছিল এমন এক শীতলতা, যা নমিতার মেরুদণ্ড বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল।

খাওয়া শেষ হলে তিনি পাশের ছোট্ট ঘরটা দেখিয়ে দিলেন।

“আজ আর বেরোবে না মা। ভোর হলে চলে যেয়ো।”

ক্লান্ত শরীর আর অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় ছিল না। নমিতা সেই ছোট্ট ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

ঘরটায় একটি পুরোনো কাঠের খাট, ছেঁড়া মশারি আর আধভাঙা জানালা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বাইরে ঝড়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত ভয়কে হারিয়ে দিল।

কখন যে তার ঘুম নেমে এসেছিল, সে জানত না।

হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল।

কেন ভাঙল, প্রথমে বুঝতে পারল না। চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বৃষ্টির শব্দ প্রায় থেমে এসেছে। শুধু দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে এক অস্বাভাবিক শব্দ।

“রি... রি... রি...”

শব্দটা যেন মানুষের গলা থেকে বেরোচ্ছে, অথচ মানুষের গলার মতো নয়। কর্কশ, ফাঁপা, অসহ্য।

নমিতার বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল।

সে ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে দরজা খুলল।

অন্ধকার করিডোরে দাঁড়াতেই শব্দটা আরও স্পষ্ট শোনা গেল।

“রি... রি... রি...”

শব্দটা বৃদ্ধার ঘর থেকেই আসছে।

কাঁপতে কাঁপতে সে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আলতো করে ডাকল—

“বুড়িমা...?”

কোনো উত্তর নেই।

আরও একবার ডাকতেই কোনো অদৃশ্য শক্তির টানে দরজাটা কড়কড় শব্দ করে নিজে থেকেই খুলে গেল।

পরের মুহূর্তেই নমিতার সমগ্র অস্তিত্ব যেন জমে বরফ হয়ে গেল।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধা।

কিন্তু তিনি আর মানুষ নন।

সাদা চুলগুলো ঝড়ের বাতাসে উন্মাদের মতো উড়ছে। চোখ দুটো লেলিহান আগুনের মতো জ্বলছে। ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। আর সেই ভয়াবহ “রি... রি... রি...” শব্দটা তাঁর গলার গভীর থেকে বেরিয়ে এসে পুরো ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

নমিতা আতঙ্কে পিছিয়ে আসতে গিয়েই শুনল—ধাম!

দরজাটা নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে।

সে মরিয়া হয়ে দরজা খুলতে চেষ্টা করল। কাঠের দরজায় হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল। কিন্তু দরজা একচুলও নড়ল না।

ঠিক তখনই ঘরের ভেতরের বাতাস অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে উঠল।

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

এগোতে এগোতে তাঁর হাতের আঙুলগুলো লম্বা হতে লাগল। নখগুলো ধারালো, বাঁকা। আর হাঁটার সময় নমিতা দেখল—তাঁর দুই পা উল্টো দিকে ঘোরানো।

তার বুক থেকে এক অসহায় চিৎকার বেরিয়ে এল।

“আমাকে যেতে দিন... আমার মা অপেক্ষা করছে...”

বৃদ্ধার মুখে ধীরে ধীরে এক বিকৃত হাসি ফুটে উঠল।

“অনেকদিন... অনেকদিন পর মানুষ পেলাম... খুব খিদে পেয়েছে...”

পরের মুহূর্তে তিনি অমানুষিক গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

নমিতা মেঝেতে ছিটকে পড়ল। মাথা সজোরে আঘাত করল শক্ত মেঝেতে। চোখের সামনে সবকিছু ঘুরে উঠল। অস্পষ্ট দৃষ্টির মধ্যে সে শুধু দেখল সেই বিভৎস মুখটা আরও কাছে নেমে আসছে।

তারপর শুরু হলো এক অসহনীয় যন্ত্রণা।

সে চিৎকার করছিল, কাঁদছিল, প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করছিল। কিন্তু শরীরের শক্তি যেন মুহূর্তের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেল। হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। চেতনা ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিল।

শেষ মুহূর্তে তার মনে পড়ল একমাত্র মায়ের কথা।

মা এখন নিশ্চয়ই আমার জন্য অপেক্ষা করছে...

তার বন্ধ হয়ে আসা চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা জল।

ঠিক সেই সময় দূর থেকে ভেসে এল পরিচিত একটি কণ্ঠ—

“নমিতা... ওরে নমিতা... ওঠ মা...”

কণ্ঠস্বরটা যেন ধীরে ধীরে অন্ধকার ভেদ করে তার কাছে পৌঁছে গেল।

সে ধড়মড় করে উঠে বসল।

চারদিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত কিছুই বুঝতে পারল না।

তারপর ধীরে ধীরে বুঝল—সে নিজের ঘরেই শুয়ে আছে।

চারুবালা দেবী উদ্বিগ্ন মুখে তার কাঁধে হাত রেখে বসে আছেন। বাইরে এখনও টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। জানলার ফাঁক দিয়ে ভোরের ফ্যাকাশে আলো ঘরে ঢুকেছে।

“খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস নাকি?”—মায়ের গলায় উৎকণ্ঠা।

নমিতা কোনো উত্তর দিল না।

সে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল। এতক্ষণে বুঝতে পারল, সে বেঁচে আছে। সবটাই ছিল এক দুঃস্বপ্ন।

কিন্তু মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল নিজের ডান কবজির দিকে।

সেখানে পাঁচটি কালচে আঁচড় স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে।

যেন কোনো অস্বাভাবিক লম্বা নখ গভীরভাবে চেপে ধরেছিল তাকে।

বাইরে ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল।

আর দূরের কোথাও, বৃষ্টির একটানা শব্দের আড়ালে, খুব ক্ষীণভাবে যেন আবারও ভেসে এল—

“রি... রি... রি...”

📖 পাঠকদের জন্য

গল্পটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে আপনার মতামত অবশ্যই কমেন্টে জানান। আপনার একটি মন্তব্য, একটি শেয়ার কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে গল্পটি ভাগ করে নেওয়াই নতুন নতুন বাংলা গল্প লেখার অনুপ্রেরণা।

আরও বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং সাহিত্যভিত্তিক লেখার জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন — www.authortanmoyroy.com

✍️ লেখক পরিচিতি

Tanmoy Roy একজন বাংলা কথাসাহিত্যিক, যিনি মনস্তাত্ত্বিক, রহস্য, হরর, থ্রিলার এবং আবেগঘন মানবিক গল্প লিখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখায় বাস্তব জীবনের অনুভূতি, সম্পর্কের গভীরতা এবং অপ্রত্যাশিত মোড় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

আপনি তাঁর বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম পড়তে পারেন নিচের লিংকগুলো থেকে—

Follow the Author

নতুন গল্প, বই প্রকাশের খবর এবং লেখালেখির আপডেট পেতে আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকুন।

ধন্যবাদ। আপনার পাঠই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।