আমার কালি - TANMOY ROY
বাড়িতে কোনো পোষা প্রাণী থাকলে একসময় তারা যে পরিবারের একজন হয়ে যায়, এই কথাটা আগে অনেকবার শুনেছিলাম। কিন্তু সেই কথার গভীরতা কখনো সত্যি করে অনুভব করিনি।
যতদিন না পর্যন্ত আমার জীবনে এসেছিল একটা ছোট্ট কালো বিড়াল।
কালি।
একটা ছোট্ট প্রাণী, যার শরীর জুড়ে ছিল কুচকুচে কালো রং। যার মুখে ছিল না কোনো ভাষা, যার হাতে ছিল না কাউকে ধরে রাখার ক্ষমতা। তবুও অদ্ভুতভাবে সে আমার জীবনের এমন একটা জায়গা দখল করে নিয়েছিল, যেটা আজও খালি হয়ে আছে।
আজও সন্ধ্যার সময় যখন বাড়ির উঠোনে হালকা বাতাস বয়ে যায়, যখন দূর থেকে কোনো স্কুটির শব্দ ভেসে আসে, তখন অজান্তেই আমার মন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
মনে হয়—
“কালি কি আবার দৌড়ে আসছে?”
হয়তো একটু পরেই উঠোনের কোণ থেকে ওর ছোট ছোট পায়ের শব্দ শোনা যাবে। লেজটা উঁচু করে, চোখে সেই চেনা আনন্দ নিয়ে ও ছুটে আসবে আমার দিকে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—
কালি আর নেই।
প্রায় দু’বছর আগে আমাদের পাশের বাড়িতে একটা কালো বিড়ালের জন্ম হয়েছিল। জন্মের পর থেকেই ওর শরীর ছিল একদম অন্যরকম। চারপাশে অনেক রঙের বিড়াল দেখা গেলেও, ও ছিল সম্পূর্ণ কালো। যেন রাতের অন্ধকার থেকে কেউ একটা ছোট্ট প্রাণকে তুলে এনে পৃথিবীতে রেখে দিয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই ও পাশের বাড়িতেই থাকত। সেখানেই খেত, ঘুমাত, বড় হতো। আমাদের বাড়িতে ওর আসা-যাওয়া ছিল ঠিকই, কিন্তু তখনও সে আমাদের পরিবারের কেউ হয়ে ওঠেনি।
সেই সময় আমি কাজের কারণে আগরতলায় ভাড়া থাকতাম। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন শহরের ব্যস্ততার মধ্যে কেটে যেত। বাড়ি ফিরতাম শুধু weekend-এ।
তাই পাশের বাড়ির সেই ছোট্ট কালো বিড়ালটার দিকে খুব একটা মনোযোগ দেওয়া হতো না।
হয়তো সেও আমাকে তেমন চিনত না।
কিন্তু সময় কখনো কখনো নিঃশব্দে এমন কিছু সম্পর্ক তৈরি করে দেয়, যার শুরু আমরা বুঝতেই পারি না।
ধীরে ধীরে লক্ষ্য করলাম, কালো বিড়ালটা আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছে।
মা রান্নাঘরে গেলে ও নিঃশব্দে মায়ের পেছনে পেছনে যেত। বাবা বিকেলে উঠোনে বসলে, ও এসে বাবার পাশে বসে থাকত।
যেন ও বুঝে গিয়েছিল—এই মানুষগুলোই তার নিজের মানুষ।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, আমি যখন বাড়িতে থাকতাম না, তখন নাকি ও আমার বিছানায় গিয়ে ঘুমাত।
প্রথমবার শুনে আমার একটু বিরক্তিই হয়েছিল।
আমার বিছানায় একটা বিড়াল ঘুমাবে—এই ব্যাপারটা তখন আমার একদম পছন্দ ছিল না।
তাই কালি যখন আমার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করত, আমি খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না।
কিন্তু মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারে না, কখন একটা ছোট্ট প্রাণী ধীরে ধীরে তার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।
কালির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল।
একদিন দুপুরবেলা খাওয়া শেষ করে আমি ঘরে এসে বিছানায় শুয়েছিলাম। চারপাশে একটা শান্ত পরিবেশ। জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছিল।
চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।
হঠাৎ অনুভব করলাম, কেউ যেন ধীরে ধীরে বিছানার উপর উঠে আসছে।
চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি—
কালি।
ও খুব শান্তভাবে আমার পায়ের কাছে এসে বসেছে।
আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। অভ্যাস না থাকায় বিরক্ত হয়ে হালকা করে ওকে নিচে নামিয়ে দিলাম।
কালি নিচে নেমে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল।
সেই চোখের দৃষ্টি আজও আমার মনে আছে।
ওর সবুজাভ চোখ দুটোতে যেন একটা অভিমান ছিল, আবার তার মধ্যেই ছিল অদ্ভুত এক ভালোবাসা।
তারপর খুব আস্তে করে একটা শব্দ করল—
“মিঁয়াও…”
সেটা সাধারণ কোনো ডাক ছিল না।
মনে হয়েছিল, ও যেন বলছে—
“আমি তো শুধু তোমার কাছে একটু থাকতে চেয়েছিলাম।”
সেই মুহূর্তে আমার ভেতরের সমস্ত বিরক্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
হঠাৎ মনে হলো, এই ছোট্ট প্রাণীটা কোনো দুষ্টুমি করতে আসেনি। সে শুধু একটু ভালোবাসা খুঁজতে এসেছিল।
আর সেদিন থেকেই সবকিছু বদলে গেল।
কালি আর শুধু পাশের বাড়ির একটা বিড়াল রইল না।
সে ধীরে ধীরে আমাদের বাড়ির, আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠল।
সেদিনের পর থেকে কালি যেন একটু একটু করে আমার জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করল।
আগে যে বিড়ালটাকে আমি খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না, কখন যে সেই ছোট্ট কালো প্রাণীটা আমার প্রতিদিনের অভ্যাসের একটা অংশ হয়ে উঠেছিল, সেটা নিজেও বুঝতে পারিনি।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আসে খুব নিঃশব্দে।
কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না, কোনো প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন হয় না। শুধু একসঙ্গে কিছু মুহূর্ত কাটাতে কাটাতেই একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়ে যায়।
কালির সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ঠিক তেমনই ছিল।
আমি বাড়িতে থাকলেই ও যেন সবসময় আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করত।
আমি খেতে বসলে একটু দূরে বসে থাকত। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখত, আমি কী করছি।
মাঝে মাঝে মনে হতো, ও শুধু খাবারের জন্য নয়, আমার সঙ্গ পাওয়ার জন্যই সেখানে বসে আছে।
আমি বিছানায় শুতে গেলে কালি ধীরে ধীরে এসে ঘরের এক কোণে গোল হয়ে শুয়ে থাকত।
কখনো একটু পরে উঠে এসে আমার কাছাকাছি বসত।
কখনো আবার কোনো শব্দ না করে শুধু পাশে পড়ে থাকত।
ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল।
যেন আমার পাশে থাকলেই ওর পৃথিবীটা সম্পূর্ণ হয়ে যেত।
মা আমার পুরোনো একটা শার্ট বিছানার এক পাশে রেখে দিয়েছিল। কালি সেই শার্টটার উপর ঘুমাতে ভীষণ ভালোবাসত।
প্রথমে ব্যাপারটা দেখে অবাক হয়েছিলাম।
একটা পুরোনো শার্টের মধ্যে এমন কী আছে, যার জন্য একটা বিড়াল এতটা আকৃষ্ট হয়?
পরে বুঝেছিলাম, হয়তো সেই কাপড়ে আমার গায়ের পরিচিত গন্ধ ছিল।
একটা ছোট্ট প্রাণীও নিজের আপন মানুষকে চিনতে পারে।
তার ভালোবাসার ভাষা হয়তো আমাদের মতো নয়, কিন্তু অনুভূতিটা ঠিক একই রকম।
আমি যখন আগরতলা থেকে বাড়ি ফিরতাম, তখন কালির আনন্দ দেখার মতো ছিল।
দূর থেকে আমার স্কুটির শব্দ শুনলেই ও যেন বুঝে যেত আমি আসছি।
বাড়ির গেটের কাছে ছুটে আসত।
লেজটা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত।
কখনো কখনো এত উত্তেজিত হয়ে যেত যে, আমার চারপাশে ঘুরতে শুরু করত।
মনে হতো, অনেকদিন পর কোনো প্রিয় মানুষকে ফিরে পেয়েছে।
সেই মুহূর্তগুলো দেখলে আমার মাঝে মাঝে অবাক লাগত।
একটা অবলা প্রাণীও কি কাউকে এভাবে অপেক্ষা করতে পারে?
কাউকে নিজের মানুষ বলে মনে করতে পারে?
কালিকে না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই করতাম না।
কালির নামটাও একটা সুন্দর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আমার girlfriend-ই ওর নাম রেখেছিল—"কালি"।
কারণ ওর পুরো শরীরটাই ছিল একদম কালো।
প্রথমবার নামটা শুনে একটু হেসেছিলাম।
ভাবছিলাম, একটা বিড়ালের নাম আবার কালি হয় নাকি!
কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, এই নামটাই যেন ওর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানিয়ে গেছে।
কালো রঙের সেই ছোট্ট শরীর, আর তার মধ্যে জ্বলজ্বল করা সবুজাভ চোখ দুটো—কালিকে আলাদা একটা সৌন্দর্য দিয়েছিল।
রাতে যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে যেত, তখন দূর থেকে শুধু ওর চোখ দুটো দেখা যেত।
মনে হতো, অন্ধকারের মধ্যেও দুটো ছোট্ট আলো জ্বলছে।
তারপর থেকে সবাই ওকে কালি বলেই ডাকত।
আর কালি যেন নিজের নামটাও চিনে গিয়েছিল।
নাম ধরে ডাকলেই কান খাড়া করে তাকাত।
কখনো ধীরে ধীরে হেঁটে কাছে চলে আসত।
কালির কিছু নিজস্ব অভ্যাস ছিল, যেগুলো এখন মনে পড়লে চোখের সামনে ওর ছবি ভেসে ওঠে।
বিকেল হলেই ও রান্নাঘরের দিকে চলে যেত।
মা যখন রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকত, কালি তখন একদম সামনে গিয়ে বসে পড়ত।
তারপর তাকিয়ে থাকত powder milk-এর jar-এর দিকে।
আর কিছুক্ষণ পর শুরু হতো ওর পরিচিত ডাক—
“মিঁয়াও… মিঁয়াও…”
মনে হতো, ও যেন নিজের ভাষায় বলছে—
“আমার দুধটা দাও।”
মায়েরও বুঝতে অসুবিধা হতো না।
কালির আবদার মানেই ছিল দুধ তৈরি করা।
তবে খাবারের ব্যাপারে কালি ছিল ভীষণ রকমের বেছে খাওয়া প্রাণী।
সাধারণভাবে ভাত দিলেই মুখ ঘুরিয়ে নিত।
কিন্তু তার সঙ্গে যদি একটু মাছের ঝোল, ডাল বা দুধ মেশানো থাকত, তাহলে তার আর কোনো আপত্তি থাকত না।
মাঝে মাঝে ওর এই জেদ দেখে হাসি পেত।
ভাবতাম—
“এত ছোট্ট একটা প্রাণী, অথচ নিজের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কতটা সচেতন!”
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হতো কালির সবচেয়ে প্রিয় সময়।
সারাদিনের শান্ত, চুপচাপ কালি তখন হঠাৎ যেন অন্য একটা প্রাণী হয়ে যেত।
লেজটা উঁচু করে পুরো ঘর জুড়ে দৌড়াত।
কখনো বিছানার নিচে লুকিয়ে পড়ত।
আবার হঠাৎ কোথা থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসত।
কখনো নিজের ছায়ার সঙ্গেই খেলত।
ওর এই ছোট ছোট দুষ্টুমি দেখলে বাড়ির পরিবেশটাই বদলে যেত।
মনে হতো, ঘরের মধ্যে একটা ছোট্ট বাচ্চা খেলছে।
আর আমরা সবাই নীরবে সেই আনন্দ দেখছি।
সবচেয়ে সুন্দর লাগত ওর ঘুমানোর সময়।
একদম মানুষের ছোট বাচ্চাদের মতো কুঁকড়ে ঘুমাত।
কখনো আবার চার পা ছড়িয়ে এমন নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকত, যেন পৃথিবীতে কোনো ভয় নেই।
সেই মুহূর্তগুলো দেখলে মনে হতো—
একটা প্রাণী যখন কোনো জায়গাকে নিজের নিরাপদ আশ্রয় মনে করে, তখন সে কতটা নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে পারে।
কালির কাছে আমাদের বাড়িটাই ছিল তার পৃথিবী।
আর ধীরে ধীরে আমরাও বুঝতে শুরু করেছিলাম—
কালি শুধু আমাদের বাড়িতে থাকত না।
কালি আমাদের সঙ্গে থাকত।
সময় কখন যে আমাদের সম্পর্কগুলোকে আরও গভীর করে দেয়, সেটা আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না।
কালির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই হয়েছিল।
যে ছোট্ট কালো বিড়ালটাকে একসময় শুধু পাশের বাড়ির একটা প্রাণী বলে মনে হয়েছিল, ধীরে ধীরে সে আমাদের পরিবারের প্রতিদিনের জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছিল।
বাড়ির দরজা খুললেই মনে হতো, কালি হয়তো কোথাও থেকে বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে যাবে।
সকালবেলা উঠোনে রোদ পড়লে ওকে প্রায়ই দেখা যেত রোদের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকতে।
চোখ আধবোজা করে, শরীরটা মেলে দিয়ে ও যেন নিজের মতো করে সকালটা উপভোগ করত।
মাঝে মাঝে আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওকে দেখতাম।
ভাবতাম—
একটা প্রাণী কত সহজে সুখ খুঁজে নিতে পারে!
ওর কোনো বড় চাহিদা ছিল না।
না ছিল কোনো অভিযোগ।
শুধু একটু খাবার, একটু নিরাপদ জায়গা আর নিজের মানুষগুলোর ভালোবাসা।
এই সামান্য জিনিসগুলোর মধ্যেই ওর পুরো পৃথিবী ছিল।
বাড়িতে আমি থাকলে কালির আচরণও যেন একটু আলাদা হয়ে যেত।
অন্যদের সঙ্গে ওর একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল ঠিকই, কিন্তু আমার কাছে এলে ওর মধ্যে একটা আলাদা আপন ভাব দেখতে পেতাম।
হয়তো কারণ, প্রথমে আমি ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম।
আর পরে যখন ওকে ভালোবাসতে শুরু করলাম, তখন সেই পরিবর্তনটা ওও বুঝেছিল।
প্রাণীরা মানুষের আচরণ খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে।
আমরা যা মুখে বলি না, তার থেকেও বেশি কিছু তারা অনুভব করতে পারে।
কালি হয়তো জানত, একসময় আমি ওকে তেমন গুরুত্ব দিতাম না।
কিন্তু পরে আমার মন বদলে গিয়েছিল।
আর সেই কারণেই হয়তো ওর ভালোবাসার মধ্যেও একটা আলাদা বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।
অনেক সময় আমি কাজের ব্যস্ততায় ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতাম।
আগরতলার ব্যস্ত রাস্তা, সারাদিনের কাজের চাপ, মানুষের ভিড়—সবকিছু মিলিয়ে মনটা ভার হয়ে থাকত।
কিন্তু বাড়িতে ঢুকেই যখন দেখতাম কালি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তখন অদ্ভুত একটা শান্তি অনুভব করতাম।
ও কিছু জিজ্ঞেস করত না।
কোনো কথা বলত না।
শুধু কাছে এসে বসে থাকত।
আর সেই নীরব সঙ্গটাই যেন অনেক কথা বলে দিত।
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেখানে কোনো শব্দের প্রয়োজন হয় না।
শুধু কারও উপস্থিতিই যথেষ্ট হয়ে যায়।
কালি আমার জীবনে ঠিক তেমন একটা উপস্থিতি ছিল।
আমার মা কালিকে নিয়ে প্রায়ই মজা করত।
বলত—
“এই বিড়ালটা তোকে ছাড়া কিছু বোঝে না।”
আমি হাসতাম।
বলতাম—
“আরে, ও তো শুধু খাবারের জন্য আসে।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমিও জানতাম, ব্যাপারটা শুধু খাবারের ছিল না।
খাবার তো অন্য জায়গাতেও পেত।
কিন্তু তারপরও কেন বারবার আমাদের বাড়িতে আসত?
কেন আমার ঘরে এসে শুয়ে থাকত?
কেন আমার স্কুটির শব্দ শুনেই দৌড়ে বেরিয়ে আসত?
এর উত্তর হয়তো শুধু ভালোবাসা।
কালির সবচেয়ে সুন্দর একটা অভ্যাস ছিল—ও কখনো জোর করে নিজের ভালোবাসা দেখাত না।
ও চুপচাপ নিজের জায়গা থেকে ভালোবাসত।
যখন ইচ্ছে হতো কাছে আসত।
যখন ইচ্ছে হতো একটু দূরে বসে থাকত।
কিন্তু সবসময় একটা অদৃশ্য বন্ধনে আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকত।
অনেক সময় রাতে ঘুমানোর আগে আমি ওকে খুঁজতাম।
দেখতাম, হয়তো ঘরের কোনো কোণে বসে আছে।
আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—
আমি ঠিক আছি তো?
আজ ভাবলে অবাক লাগে, একটা ছোট্ট প্রাণী কীভাবে একটা বাড়ির পরিবেশ বদলে দিতে পারে।
কালি আসার আগে বাড়িটা ছিল শুধু একটা বাড়ি।
কিন্তু কালি আসার পর সেখানে একটা আলাদা প্রাণ চলে এসেছিল।
ওর জন্য কেউ রান্নাঘরে দুধ তৈরি করত।
ওর জন্য কেউ দরজা খোলা রাখত।
ওর জন্য কেউ সন্ধ্যায় একটু অপেক্ষা করত।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
ওর জন্য একটা জায়গা তৈরি হয়েছিল আমাদের হৃদয়ে।
কিন্তু জীবন সবসময় একইভাবে চলে না।
যে সুখের মুহূর্তগুলোকে আমরা চিরস্থায়ী মনে করি, সেগুলোই কখনো কখনো খুব অল্প সময়ের জন্য আসে।
আমরা তখন বুঝতে পারি না, ভালো সময়ের আড়ালে কখন কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
কালির জীবনেও সেই পরিবর্তনের দিন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।
একটা ছোট্ট সমস্যা, যেটাকে আমরা প্রথমে খুব সাধারণ ভেবেছিলাম, পরে সেটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল।
পাশের বাড়ির সেই বড় brown colour-এর বিড়ালটার সঙ্গে কালির ঝামেলা শুরু হয়েছিল।
প্রথমে আমরা বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি।
ভাবতাম, বিড়ালদের মধ্যে এমন একটু-আধটু হয়েই থাকে।
কিন্তু আমরা তখনও জানতাম না—
এই ছোট ছোট ঝগড়াগুলো একদিন আমাদের কালি-কে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেবে।
আর আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে আমাদের বাড়ির সেই ছোট্ট কালো প্রাণটাকে।
শুরুতে আমরা কেউই বুঝতে পারিনি যে, কালির জীবনে একটা কঠিন সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
বিড়ালদের মধ্যে ছোটখাটো ঝামেলা, দৌড়াদৌড়ি, একে অপরকে তাড়া করা—এসব তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।
তাই পাশের বাড়ির সেই brown colour-এর বিড়ালটার সঙ্গে কালির ঝামেলাকেও আমরা প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি।
ভাবতাম, কিছুক্ষণ পর আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, ভেতরে তার প্রভাব অনেক গভীর হতে পারে।
কালির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই হয়েছিল।
আগে কালি যখন বাইরে যেত, তখন তার মধ্যে একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস দেখা যেত।
লেজটা উঁচু করে হাঁটত।
এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত।
কখনো উঠোনে বসে রোদ পোহাত, কখনো আবার নিজের মতো করে খেলত।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখতে পেলাম।
আগের মতো আর দৌড়াত না।
আগের মতো চঞ্চল থাকত না।
অনেক সময় চুপচাপ একটা জায়গায় বসে থাকত।
প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো সামান্য ক্লান্ত।
কিংবা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন হচ্ছে।
কিন্তু মনের ভেতরে কোথাও একটা অজানা ভয় তৈরি হচ্ছিল।
কালি আগের মতো খাওয়ার জন্য জেদ করত না।
যে প্রাণীটা একটু ভালো খাবারের জন্য রান্নাঘরের সামনে বসে থাকত, সেই কালি ধীরে ধীরে খাবারের প্রতিও আগ্রহ হারাতে শুরু করল।
মা ডাকত—
“কালি, আয় দুধ খেয়ে যা।”
কিন্তু আগের মতো ছুটে আসত না।
ধীরে ধীরে হাঁটত।
চোখের মধ্যে যেন একটা ক্লান্তি দেখা যেত।
আমরা তখনও বুঝতে পারিনি, ওর ছোট্ট শরীরটা ভেতরে ভেতরে কতটা লড়াই করছে।
মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে।
যখন কোনো প্রিয় মানুষ বা প্রিয় প্রাণী কষ্টে থাকে, তখন আমরা অনেক সময় বিশ্বাস করতে চাই না যে সত্যিই কোনো খারাপ কিছু হতে পারে।
আমরাও হয়তো সেই ভুলটাই করেছিলাম।
মনে মনে ভাবতাম—
“কালি ঠিক হয়ে যাবে।”
“কয়েকদিন পর আবার আগের মতো দৌড়াবে।”
“আবার স্কুটির শব্দ শুনে গেটের কাছে ছুটে আসবে।”
কিন্তু সময় সবসময় আমাদের ইচ্ছেমতো চলে না।
এরপর একটা সময় এল, যখন কালি প্রায় খাওয়াই বন্ধ করে দিল।
জলও ঠিকমতো খেতে চাইত না।
ওর চোখের সেই চেনা উজ্জ্বলতা যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল।
যে চোখ দুটো একসময় অন্ধকার রাতেও দুটো ছোট্ট আলোর মতো জ্বলজ্বল করত, সেখানে তখন একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা দেখা যেত।
মা বারবার চেষ্টা করত ওকে কিছু খাওয়ানোর।
কখনো দুধ দিত।
কখনো পছন্দের খাবার সামনে রাখত।
কিন্তু কালি আগের মতো আগ্রহ দেখাত না।
শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকত।
সেই সময় আমি বেশিরভাগ দিন আগরতলাতেই থাকতাম।
কাজের ব্যস্ততার কারণে সবসময় বাড়িতে থাকা সম্ভব হতো না।
তবুও প্রতিদিন মনে হতো, বাড়িতে গেলে কালিকে একটু সময় দেব।
ওকে কোলে নেব।
ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেব।
কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না, কিছু মুহূর্ত হয়তো শেষবারের মতো আসছে।
আমরা ভাবি—
“পরে করব।”
“আরেকদিন সময় দেব।”
কিন্তু সেই "আরেকদিন" কখনো কখনো আর আসে না।
সেদিনও আমি আগরতলায় ছিলাম।
দিনটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
কাজের মধ্যে ব্যস্ত ছিলাম।
বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল।
কিন্তু বিকেলের দিকে বাবার ফোন এল।
ফোনটা হাতে নেওয়ার আগেই জানি না কেন, মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
সাধারণত বাবা ফোন করলে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতেন।
কিন্তু সেদিন ফোন ধরার পরই বাবার কণ্ঠে একটা ভারী ভাব অনুভব করলাম।
কিছু একটা যেন ঠিক নেই।
আমি বললাম—
“হ্যালো বাবা?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর বাবা খুব ধীরে ধীরে বলল—
“আমাদের কালি আর নেই…”
কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশের সব শব্দ থেমে গেল।
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
শুধু ফোনটা কানে ধরে বসে রইলাম।
মনে হচ্ছিল, কেউ যেন হঠাৎ করে আমার পরিচিত পৃথিবীর একটা অংশ কেড়ে নিয়েছে।
বাবা ধীরে ধীরে সবটা বলছিল।
দুপুরের দিকে কালি হঠাৎ বমি করতে শুরু করেছিল।
মা তাড়াতাড়ি জল এনে দিয়েছিল।
কালি অনেকটা জল খেয়েছিল।
কিন্তু তারপর আবার বমি।
আর সেই বমির সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল একটা লম্বা tapeworm।
তারপর কিছুক্ষণ ছটফট করেছিল ছোট্ট প্রাণীটা।
আর তারপর…
সব শান্ত হয়ে গিয়েছিল।
বাবার কথা শুনছিলাম।
কিন্তু কিছুই যেন মাথায় ঢুকছিল না।
শুধু একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল—
আমি কেন তখন বাড়িতে ছিলাম না?
কেন শেষবার ওকে আদর করতে পারলাম না?
কেন ওর মাথায় হাত রেখে বলতে পারলাম না—
“কালি, আমি আছি।”
সেদিন বুঝেছিলাম, ভালোবাসার সবচেয়ে কষ্টের দিক হলো বিদায়।
যে প্রাণীটা প্রতিদিন আমার অপেক্ষা করত, যাকে দেখলে বাড়িতে ফেরার আনন্দ আরও বেড়ে যেত, সে আর কখনো আমার স্কুটির শব্দ শুনে দৌড়ে আসবে না।
আর সেই সত্যিটা মেনে নেওয়া ছিল ভীষণ কঠিন।
কালি চলে গিয়েছিল।
কিন্তু সে শুধু একটা প্রাণী হয়ে যায়নি।
সে রেখে গিয়েছিল অসংখ্য স্মৃতি।
আর সেই স্মৃতিগুলোই আজও আমাদের বাড়িতে নিঃশব্দে বেঁচে আছে।
কালি চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, ও আর নেই।
মানুষ যখন কোনো প্রিয় মানুষকে হারায়, তখন হয়তো সেই শূন্যতাটা সবাই বুঝতে পারে।
কিন্তু একটা প্রাণীকে হারানোর কষ্টটা অনেক সময় বোঝানো যায় না।
কারণ সেখানে কোনো বড় বিদায় থাকে না।
কোনো শেষ কথা বলা হয় না।
কোনো শেষবারের মতো জানানো হয় না—
“আমি চলে যাচ্ছি।”
সবকিছু হঠাৎ করেই থেমে যায়।
একদিন যে প্রাণীটা ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পরের দিন সেই জায়গাটাই অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
কালি চলে যাওয়ার পর বাড়ির পরিবেশটা যেন বদলে গিয়েছিল।
আগে বিকেল হলেই মনে হতো, এখনই হয়তো কালি রান্নাঘরের সামনে গিয়ে বসবে।
মা দুধের jar বের করবে।
আর কালি তার পরিচিত ডাক শুরু করবে—
“মিঁয়াও… মিঁয়াও…”
কিন্তু আর সেই শব্দ শোনা যেত না।
রান্নাঘরটা একই ছিল।
দুধের jar-টাও একই জায়গায় রাখা ছিল।
কিন্তু যে ছোট্ট প্রাণীটার জন্য এত কিছু ছিল, সে আর ছিল না।
কখনো কখনো একটা জায়গার মূল্য আমরা তখনই বুঝতে পারি, যখন সেই জায়গাটা কোনো পরিচিত উপস্থিতিকে হারায়।
বাড়িতে গেলে এখনও অভ্যাসবশত আমার চোখ প্রথমে খুঁজে নিত কালিকে।
গেটের কাছে তাকাতাম।
উঠোনের দিকে তাকাতাম।
ঘরের কোণগুলো দেখতাম।
মনের একটা অংশ তখনও বিশ্বাস করতে চাইত—
হয়তো কালি কোথাও লুকিয়ে আছে।
হয়তো একটু পরেই বেরিয়ে এসে আমার দিকে তাকাবে।
হয়তো আবার লেজ উঁচু করে আমার চারপাশে ঘুরবে।
কিন্তু তারপরই বাস্তবতা মনে করিয়ে দিত—
কালি আর ফিরবে না।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো রাতে।
কারণ রাত হলেই কালির অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যেত।
যে সময়টায় ও ঘরের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করত, সেই সময়টা এখন অনেক শান্ত হয়ে গিয়েছিল।
কোনো ছোট ছোট পায়ের শব্দ নেই।
বিছানার নিচে লুকিয়ে থাকার কোনো দুষ্টুমি নেই।
হঠাৎ কোথা থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসার কোনো চমক নেই।
শুধু একটা নীরবতা।
একটা অদ্ভুত শূন্যতা।
অনেক সময় বিছানায় শুয়ে থাকলে মনে হতো, কালি বুঝি আবার এসে আমার পাশে বসেছে।
অভ্যাসবশত হাত বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করত।
মনে হতো, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই মনে পড়ত—
সেই ছোট্ট কালো শরীরটা আর নেই।
সেই সবুজাভ চোখ দুটো আর আমাকে দেখবে না।
মা এখনও মাঝে মাঝে কালির কথা বলে।
কোনো একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলে হঠাৎ বলে ওঠে—
“কালি থাকলে এখন এটা করত।”
অথবা—
“কালি হলে এই খাবারটা দেখেই চলে আসত।”
তখন বুঝি, শুধু আমার নয়, কালির সঙ্গে সবারই একটা আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
ও শুধু আমার কাছে প্রিয় ছিল না।
ও পুরো বাড়ির একটা অংশ হয়ে গিয়েছিল।
অনেকে হয়তো বলবে—
“এ তো শুধু একটা বিড়াল ছিল।”
কিন্তু যারা কোনো প্রাণীকে নিজের পরিবারের মতো ভালোবেসেছে, তারা জানে এই কথাটা কতটা অসম্পূর্ণ।
কারণ ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই।
কেউ মানুষ হয়েও ভালোবাসা দিতে পারে না।
আবার কেউ একটা ছোট্ট প্রাণী হয়েও নিজের সমস্ত বিশ্বাস আর ভালোবাসা দিয়ে দিতে পারে।
কালি কথা বলতে পারত না।
কিন্তু ও বুঝতে পারত।
ও জানত কখন আমরা বাড়ি ফিরেছি।
ও জানত কার কাছে গিয়ে বসলে আদর পাওয়া যাবে।
ও জানত কোন জায়গাটা তার নিজের।
আজও যখন সন্ধ্যার সময় দূর থেকে কোনো স্কুটির শব্দ শুনি, কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনটা ভুল করে।
মনে হয়—
কালি বুঝি আবার ছুটে আসছে।
হয়তো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে।
হয়তো আমার দিকে তাকিয়ে সেই পরিচিত ডাক দিচ্ছে।
কিন্তু তারপর আবার মনে পড়ে—
কিছু মানুষ আর কিছু প্রাণী চলে যাওয়ার পরও আমাদের অভ্যাসের মধ্যে বেঁচে থাকে।
কালিও ঠিক তেমনই।
কালির সঙ্গে কাটানো সময়গুলো এখন আমার কাছে শুধু স্মৃতি নয়।
ওগুলো আমার জীবনের একটা সুন্দর অধ্যায়।
একটা ছোট্ট কালো বিড়াল আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে—
ভালোবাসার জন্য ভাষার প্রয়োজন হয় না।
ভালোবাসার জন্য বড় কোনো কাজের প্রয়োজন হয় না।
কখনো কখনো শুধু কারও পাশে চুপচাপ বসে থাকাই যথেষ্ট।
কালি হয়তো আজ আর আমাদের উঠোনে ঘুরে বেড়ায় না।
আমার বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে না।
রান্নাঘরের সামনে বসে দুধের জন্য অপেক্ষা করে না।
কিন্তু তারপরও ও আমাদের বাড়ির একটা অংশ হয়ে আছে।
আমাদের কথার মধ্যে।
আমাদের স্মৃতির মধ্যে।
আমাদের ভালোবাসার মধ্যে।
কখনো কখনো রাতে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়—
হয়তো পৃথিবীর কোথাও কোনো এক শান্ত জায়গায় কালি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
যেমন করে আমাদের বাড়ির উঠোনে রোদের মধ্যে ঘুমাত।
যেমন করে আমার পুরোনো shirt-এর উপর মাথা রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকত।
আর হয়তো সেখান থেকেও সে জানে—
একটা ছোট্ট কালো প্রাণীকে আমরা কখনো ভুলিনি।
কালি, তুই যেখানে আছিস ভালো থাকিস।
তুই শুধু একটা বিড়াল ছিলি না।
তুই ছিলি আমাদের পরিবারের একজন।
আমাদের বাড়ির হাসির একটা কারণ।
আমাদের স্মৃতির একটা সুন্দর অংশ।
আর যতদিন আমরা তোকে মনে রাখব, ততদিন তুই আমাদের সঙ্গেই থাকবি।
নিঃশব্দে।
চিরকাল।
📖 পাঠকদের জন্য
গল্পটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে আপনার মতামত অবশ্যই কমেন্টে জানান। আপনার একটি মন্তব্য, একটি শেয়ার কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে গল্পটি ভাগ করে নেওয়াই নতুন নতুন বাংলা গল্প লেখার অনুপ্রেরণা।
আরও বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং সাহিত্যভিত্তিক লেখার জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন — www.authortanmoyroy.com
✍️ লেখক পরিচিতি
Tanmoy Roy একজন বাংলা কথাসাহিত্যিক, যিনি মনস্তাত্ত্বিক, রহস্য, হরর, থ্রিলার এবং আবেগঘন মানবিক গল্প লিখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখায় বাস্তব জীবনের অনুভূতি, সম্পর্কের গভীরতা এবং অপ্রত্যাশিত মোড় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
আপনি তাঁর বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম পড়তে পারেন নিচের লিংকগুলো থেকে—
Follow the Author
নতুন গল্প, বই প্রকাশের খবর এবং লেখালেখির আপডেট পেতে আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকুন।
ধন্যবাদ। আপনার পাঠই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।