বাইশের কথা | A Strange Equation of Destiny – A Bengali Love Story by Tanmoy Roy
নতুন স্কুল, নতুন শহর। ক্লাস টেনের মাঝামাঝি সময়ে এসে ভর্তি হওয়াটা সহজ ছিল না। আকাশের স্বপ্ন একটাই—সে বড় হয়ে লেখক হবে। তার ব্যাগ সবসময় ভারি থাকত ডায়েরি আর কলমে। নতুন স্কুলে সে কিছুটা গুটিয়ে থাকত, নিজের মতো করে কাটাত অবসরের সময়গুলো। স্কুলের লাইব্রেরির কোণায় বসে খাতার পাতায় শব্দ বুনতে সে ভালোবাসত।
সেদিন ছিল নতুন পথচলার শুরু। স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছিল আকাশের। নতুন পরিবেশ, নতুন মুখ—সবকিছুর সাথেই মানিয়ে নিতে সে চেষ্টা করছিল। ডায়েরিটা ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু সেই দিনটি তার কাছে শুধু নতুন ক্লাসের শুরু ছিল না, ছিল এক অজানা ভবিষ্যতের প্রথম ধাপ।
ভর্তির ঠিক এক মাস পর। আকাশ স্কুলের লাইব্রেরিতে বসে লিখছিল। টিফিন পিরিয়ডে সে লাইব্রেরি থেকে বের হয়, ফিরে এসে দেখল তার টেবিলের ওপর রাখা সেই প্রিয় খাতাটা খোলা। খাতার পাতাগুলো জুড়ে কেউ যেন খামখেয়ালি হাতে অদ্ভুত সব আঁকিবুঁকি করেছে। আকাশ স্তম্ভিত হয়ে গেল। কে করল এই কাজ? লেখক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আকাশের কাছে তার ডায়েরিটা ছিল প্রাণের চেয়ে প্রিয়। এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আকাশ বেশ অস্থির হয়ে উঠল।
ঠিক আরও এক মাস পর। আকাশ প্রথম জানতে পারল যে ক্লাসের কেউ একজন তাকে খুব পছন্দ করে। স্কুলের করিডোরে এক সহপাঠী ফিসফিস করে তাকে এই কথাটি জানিয়েছিল। যদিও সে তখনো জানত না কে সে, তবুও আকাশের মনের কোণে এক অজানা শিহরণ খেলে গেল। কে হতে পারে সে?
আগের ঘটনার ঠিক এক মাস পর। ঈশিকা এসে আকাশকে জানাল, "যে তোমাকে পছন্দ করে, সে আমাদের ক্লাসের সেই ৫ জনের বন্ধু গ্রুপের সদস্য।" এই তথ্যটি আকাশকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাল। সে এখন সেই ৫ জনকে আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল।
সব ঘটনার ঠিক এক মাস পর। জট খুলল। আকাশ নিশ্চিত হলো যে সেই মেয়েটি রূপা। কিন্তু আকাশ তখন নিজের পড়াশোনা আর নতুন পরিবেশের চাপে এতটাই বিভ্রান্ত ছিল যে, রূপার ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সে অদ্ভুতভাবে তাকে রিজেক্ট করে দিল। কেন রিজেক্ট করল, সে নিজেও জানে না। রূপার চোখে সেদিন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা দেখেছিল সে, যা তার মনের ভেতর এক অপরাধবোধের জন্ম দিল।
রিজেকশনের পরবর্তী এক মাস। আকাশ অদ্ভুত এক অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করল। রূপাকে ক্লাসে আগের মতোই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে দেখে তার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগল। প্রতিদিন রূপাকে একা হাঁটতে দেখে আকাশের মনের কোণে ধীরে ধীরে এক অন্যরকম ভালোলাগা দানা বাঁধল। সে রূপার এক বান্ধবীকে গিয়ে তার মনের কথাগুলো খুলে বলল—সে বুঝতে পারল, সে আসলে রূপাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
পরবর্তী এক মাস পর ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। টিফিন পিরিয়ড। ক্লাসের বাকি সবাই তখন মাঠে খেলায় ব্যস্ত। ক্লাসরুমে শুধুই আকাশ আর রূপা। আকাশ জানে এটাই সুযোগ। সে রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল তার অপরাধবোধের কথা, আর তার হৃদয়ের কথা। একটি একটি করে শব্দ, অনুভূতির প্রকাশ করতে করতে কখন যে পুরো ৪৫ মিনিটের টিফিন পিরিয়ডটা শেষ হয়ে গেল, আকাশ নিজেও খেয়াল করল না। সেই নিস্তব্ধ ক্লাসরুমে রূপাকে প্রপোজ করতে করতেই তাদের প্রেমের যাত্রা শুরু হলো।
প্রপোজ করার পর আকাশ যখন রূপার হাতটা ধরে একটু আশ্বস্ত হলো, সে কৌতুহলবশত সেই পুরনো খাতাটার কথা তুলল। আকাশ হেসে বলল, "আজও রহস্য থেকে গেল যে, সেইদিন আমার খাতাটাতে কে অত আঁকিবুঁকি করেছিল!"
রূপা একটু লজ্জা পেয়ে আকাশের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তারপর আলতো হেসে পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, "সেদিন সাহস হয়নি সামনে আসার, তাই তোমার অগোচরে আমিই সেই আঁকিবুঁকিগুলো করেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম তুমি অন্তত আমার অস্তিত্বটা টের পাও।"
ভালোবাসার দিনগুলোতে আকাশ এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য লক্ষ্য করল। সে দেখল তার জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেন একটি বিশেষ তারিখের—'22nd' তারিখের সাথে সুতোর মতো গাঁথা।
আকাশ হিসেব করে দেখল: সে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল 22nd February। তার খাতার আঁকিবুঁকি ছিল 22nd March। প্রথম পছন্দ করার খবরটি এসেছিল 22nd April। ৫ জনের গ্রুপের তথ্যটা পেয়েছিল 22nd May। রূপাকে সে চিনেছিল 22nd June। রূপার বান্ধবীর কাছে নিজের অনুভূতির কথা বলেছিল 22nd July। আর রূপাকে তার হৃদয়ের সব কথা জানিয়েছিল 22nd August!
সবশেষে রূপার আইডি কার্ডের দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখল, সেখানে রোল নম্বর লেখা 22। আকাশ বুঝতে পারল, ভালোবাসা মানে শুধু দুজনে মিলে একটা গল্প তৈরি করা নয়, ভালোবাসা মানে নিয়তির পাতায় লেখা সেই অদ্ভুত কাকতালীয় যোগসূত্র, যা তাদের দুজনকেই আজীবন এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
********************
স্কুল-কলেজের রঙিন দিনগুলো আজ ধুলো পড়া ইতিহাসের মতো। সময়ের স্রোতে আকাশ আর রূপা এখন অনেক পরিণত। জীবনের বাস্তবতা স্কুলের টিফিন পিরিয়ডের ৪৫ মিনিটের মতো সহজ নয়। কর্পোরেট চাকরির ইঁদুর দৌড়, ক্যারিয়ারের অস্থিরতা, আর ব্যক্তিগত জীবন গড়ার তীব্র লড়াইয়ের মাঝে তাদের সম্পর্কের ওপর দিয়েও কম ঝড় বয়ে যায়নি।
কখনও কখনও কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে তারা একে অপরকে মাসের পর মাস পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, কিন্তু সেই সব ঝড়ের রাতে, যখন আকাশ তার ডায়েরিটা নিয়ে বসত, সে বুঝত—তার শব্দের উৎস রূপাই। আবার রূপা যখন অফিসের ল্যাপটপ সরিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরত, আকাশের মেসেজটা তাকে মনে করিয়ে দিত যে, এই লড়াইয়ে সে একা নয়।
এখনকার পরিস্থিতিটা অনেকটা থিতু হয়েছে। বাড়ির লোকজন তাদের সম্পর্কের কথা মেনে নিয়েছেন। বিয়ের কোনো তোড়জোড় বা তাড়াহুড়ো শুরু হয়নি, তবে আকাশ আর রূপা দুজনেই এখন তাদের ভবিষ্যতের কথা নিয়ে অনেক বেশি সিরিয়াস। তারা মাঝে মাঝে একা বসে ভবিষ্যতের সংসারের স্বপ্ন দেখে। সেই স্কুলবেলার আকাশ আর রূপার মধ্যে যে আবেগ ছিল, এখন তার সাথে যোগ হয়েছে এক গভীর বন্ধুত্ব আর দায়িত্ববোধ।
তারা জানে, ভবিষ্যতে বিয়ে করলে জীবন আরও জটিল হবে। কিন্তু সেই জটিলতা সামলানোর রসদ তো তারা অনেক বছর আগেই গুছিয়ে নিয়েছে। 22nd তাদের কাছে এখন আর কোনো রহস্য নয়, বরং দুই মানুষের এক হয়ে চলার এক অঘোষিত প্রতিশ্রুতি। আকাশ আজও মাঝে মাঝে ডায়েরিতে রূপার কথা লেখে—এখন আর সেখানে আঁকিবুঁকির প্রয়োজন পড়ে না, কারণ রূপা এখন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাকে নিয়ে সে আগামীর স্বপ্ন বুনে চলেছে।
📖 পাঠকদের জন্য
গল্পটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে আপনার মতামত অবশ্যই কমেন্টে জানান। আপনার একটি মন্তব্য, একটি শেয়ার কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে গল্পটি ভাগ করে নেওয়াই নতুন নতুন বাংলা গল্প লেখার অনুপ্রেরণা।
আরও বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং সাহিত্যভিত্তিক লেখার জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন — www.authortanmoyroy.com
✍️ লেখক পরিচিতি
Tanmoy Roy একজন বাংলা কথাসাহিত্যিক, যিনি মনস্তাত্ত্বিক, রহস্য, হরর, থ্রিলার এবং আবেগঘন মানবিক গল্প লিখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখায় বাস্তব জীবনের অনুভূতি, সম্পর্কের গভীরতা এবং অপ্রত্যাশিত মোড় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
আপনি তাঁর বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম পড়তে পারেন নিচের লিংকগুলো থেকে—
ধন্যবাদ। আপনার পাঠই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।