রবির বারোটা: একটি ভুতুড়ে রাতের রহস্যময় গল্প | Story by Tanmoy Roy
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারায় ঝিরিঝিরি বৃষ্টির একঘেয়ে ছন্দে শহরটা যেন আজ একটু বেশিই নিস্তব্ধ। জানালার কাঁচের ওপারে অন্ধকারের বুক চিরে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক খেলিয়ে যাচ্ছে, যা মুহূর্তের জন্য হলেও রবির ঘরটিকে এক ভৌতিক রূপ দিচ্ছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের মিটমিটে হলুদ আলো জানালার গ্রিল গলে রবির ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। সেই আলোর রেখা ঘরের কোণে রাখা পুরনো সেগুন কাঠের আলমারিটার ওপর এমনভাবে পড়েছে যে, আলমারির ছায়াটি দেয়ালে দানবের মতো দীর্ঘ হয়ে ঝুলে আছে।
রবি গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল। সারাদিনের ব্যস্ততা আর ক্লান্তি শেষে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়াটা যেন ছিল এক পরম প্রশান্তি। কিন্তু প্রকৃতির এই শান্ত সমাহারে হঠাৎই এক ছন্দপতন ঘটল। ঘুমের ঘোরেই তার কানে এল এক অদ্ভুত শব্দ—ফুসফুসের মতো নিস্তেজ, অথচ পরিচিত কোনো এক আওয়াজ। প্রথমটায় রবির অবচেতন মন সেই শব্দটিকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু শব্দটা বারবার ফিরে আসতে লাগল। যেন কেউ খুব সাবধানে আলমারির কপাটে নক করছে, আবার কখনো মনে হচ্ছে কেউ নিঃশ্বাস ছাড়ছে।
রবি ধড়ফড় করে চোখ মেলল। ঘরের আধো অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট নয়, কেবল আসবাবপত্রগুলো অস্পষ্ট দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে কান পাতল। নিস্তব্ধতাকে চিরে ভেসে এল অতি চেনা, অথচ এই মুহূর্তে মায়াবী এক ফিসফিসানি— “রবি… রবি…”
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। শরীরের সমস্ত স্নায়ু যেন একসাথে টানটান হয়ে গেছে। সে আলো জ্বালাতে চাইল, কিন্তু আতঙ্ক তাকে পাথরের মতো জমিয়ে দিয়েছে। হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসছে। তার মনে পড়ল মায়ের কথা। মা কি তাকে ডাকছেন? নাকি এটা অন্য কিছু? সে কাঁপা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল— “মা...? তুমি কি মা?”
উত্তরে কোনো সাড়া এল না। কেবল জানালার বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা বাড়ল। ল্যাম্পপোস্টের আলোটা হঠাৎ একবার কেঁপে উঠল, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। পরক্ষণেই সেই অশরীরী ফিসফিসানিটা আবার ভেসে এল, এবার যেন কিছুটা কাছে। রবি এবার ধীরগতিতে চোখ ঘোরাল সেই প্রাচীন আলমারিটার দিকে। শব্দটা যেন ওটার ভেতর থেকেই উপচে পড়ছে। এক অমোঘ আকর্ষণে সে যেন সম্মোহিত হয়ে পড়ল। তার মনে হলো, আলমারির সেই দরজাটা যদি একবার খুলে ফেলা যায়, তবেই সব রহস্যের জট খুলবে। কিন্তু ভেতর থেকে যদি কিছু বেরিয়ে আসে? এই অশুভ চিন্তাটা তাকে আরও ভীত করে তুলল।
রবি বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। মোবাইলটা খুঁজতে বালিশের পাশে হাতড়াতেই তার মনে পড়ল, সেটি সে বাইরের ঘরে ফেলে এসেছে। এখন পিছু হটার কোনো উপায় নেই। ভয়ের চোটে তার প্রতিটি হাড়ের গিঁট যেন কাঁপছে। প্রতিটি পদক্ষেপে সে আলমারির দিকে এগোতে লাগল। যত সে আলমারির কাছে যাচ্ছে, তার নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ তত প্রবল হয়ে কানে বাজছে। মনে হচ্ছিল, পুরো ঘরের নিস্তব্ধতা যেন তার ওই ধুকপুকানিকেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। সে কি এখান থেকে বেরিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে যাবে? কিন্তু শরীরের শক্তি যেন কে কেড়ে নিয়েছে।
অবশেষে সে আলমারির সামনে এসে দাঁড়াল। কপাল বেয়ে ঘামের শীতল বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। সে আলমারির পাল্লায় কান পাতল। হ্যাঁ, শব্দটা নিশ্চিতভাবেই ওপাশ থেকেই আসছে! কোনো এক অশুভ ছায়া যেন ভেতরে লুকিয়ে আছে। সে কি কোনো প্রেতাত্মা? ছোটবেলায় শোনা দাদির সেই সব গল্পের কথা মনে পড়ে গেল রবির। দাদি বলতেন, অমাবস্যার রাতে নাকি অশরীরীরা আলমারি বা পুরনো বাক্সের ভেতর লুকিয়ে থাকে। কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো সে আলমারির হ্যান্ডেলের ওপর রাখল। একবার বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস নিল সে। সাহস সঞ্চয় করে যেই না পাল্লাটা খুলতে যাবে...
—ধুম্!
মুহূর্তের মধ্যে ভেতর থেকে কেউ একজন প্রচণ্ড শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে রবির দু-হাত খপ করে ধরে ফেলল!
“ও মাগোওও!”
ভয়ে চিৎকার করে রবি সটান মাটিতে আছাড় খেল। মনে হলো, তার হৃদপিণ্ডটা বুঝি এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। তার কণ্ঠনালী দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না, কেবল চোখের সামনে এক অন্ধকার জগতের ছবি ভেসে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরো ঘরের আলো জ্বলে উঠল। তীব্র আলোয় রবির চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড কিছুই দেখতে পেল না। শুধু শুনল এক অদ্ভুত হাস্যরোল।
ধীরে ধীরে দৃষ্টি স্পষ্ট হতেই রবি যা দেখল, তা তার কল্পনারও বাইরে। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা-মা, আর তার বড় দাদা হিহি করে হাসছে। দাদা তখনো আলমারির ভেতর থেকে অর্ধেকটা বেরিয়ে আছে।
তারপরই তিনজনের মিলিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল— “HAPPY BIRTHDAY!”
রবি হতভম্ব হয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। কাঁটায় কাঁটায় রাত বারোটা। সে ভয়ের চোটে নিজের জন্মদিনের কথাই ভুলে গিয়েছিল! আলমারির সেই ‘ভূত’টি আদতে তার দাদাই ছিল। দাদা খিলখিল করে হেসে উঠল, “কী রে, কেমন চমক দিলাম? তুই তো দেখি আলমারি দেখে প্রায় হার্টফেলই করতি!”
রবি এখনো মেঝেতে বসে কাঁপছে। তার হাত-পা এখনো ঠান্ডা। ধীরে ধীরে তার শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করল। সে উঠে দাঁড়াল। তার বাবা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন তাকে, মা কপালে স্নেহের চুম্বন এঁকে দিলেন। রবি বুঝতে পারল, জীবনের সবচেয়ে ভয়ের মুহূর্তগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থেকে যায়। তার দাদা আলমারির ভেতর থেকে একটা বড় বার্থডে কেক বের করল। পুরো ঘরের পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে ভৌতিক থেকে উৎসবমুখর হয়ে উঠল।
রবি হাসি মুখে দাদাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এরকম জন্মদিনের সারপ্রাইজ আমি জীবনেও ভুলব না।”
রাত বারোটার সেই বৃষ্টিমুখর রাতে, অন্ধকারের সব ভয় কেটে গিয়ে এক পরম মমতায় ঘরটি ভরে উঠল। রবি সেদিন বুঝতে পেরেছিল, ভালোবাসার মানুষেরা যখন পাশে থাকে, তখন পৃথিবীর কোনো ভূতই ভয়ংকর নয়। এই রাতটি তার জীবনের পাতায় এক অনন্য আখ্যান হয়ে রয়ে গেল। ভয়, কৌতুহল আর ভালোবাসার এক নিখুঁত মিশ্রণ। রবির বারোটা বাজার সেই অভিজ্ঞতা এখন তার ব্লগের সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পের একটি হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি পাঠক অনুভব করবে ভয়ের শিহরণ এবং পরিবারের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
📖 পাঠকদের জন্য
গল্পটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে আপনার মতামত অবশ্যই কমেন্টে জানান। আপনার একটি মন্তব্য, একটি শেয়ার কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে গল্পটি ভাগ করে নেওয়াই নতুন নতুন বাংলা গল্প লেখার অনুপ্রেরণা।
আরও বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং সাহিত্যভিত্তিক লেখার জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন — www.authortanmoyroy.com
✍️ লেখক পরিচিতি
Tanmoy Roy একজন বাংলা কথাসাহিত্যিক, যিনি মনস্তাত্ত্বিক, রহস্য, হরর, থ্রিলার এবং আবেগঘন মানবিক গল্প লিখতে ভালোবাসেন। তাঁর লেখায় বাস্তব জীবনের অনুভূতি, সম্পর্কের গভীরতা এবং অপ্রত্যাশিত মোড় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
আপনি তাঁর বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম পড়তে পারেন নিচের লিংকগুলো থেকে—
Follow the Author
নতুন গল্প, বই প্রকাশের খবর এবং লেখালেখির আপডেট পেতে আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত থাকুন।
ধন্যবাদ। আপনার পাঠই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।