স্বপ্ন কখনও মরে না, তারা শুধু সময়ের অপেক্ষা করে

 রাত তখন প্রায় বারোটা।

বাড়ির সব আলো অনেক আগেই নিভে গেছে। চারদিকে এমন নীরবতা, যেন সময় নিজেও একটু থেমে বিশ্রাম নিচ্ছে। শুধু আমার ঘরের দরজার নিচ দিয়ে একফালি নীলচে আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।

Laptop-এর Screen-এ খোলা একটা পুরোনো Website।

অনেক বছর আগে নিজের হাতে বানানো।

Cursor-টা স্থির হয়ে আছে একটা Story-র ওপর। গল্পটার নাম দেখেই অদ্ভুত একটা হাসি চলে এল মুখে। হাসিটা আনন্দের নয়—বরং অনেক পুরোনো একটা স্মৃতিকে বিদায় জানানোর।

Mouse-এর ওপর আঙুলটা রেখে অনেকক্ষণ বসে রইলাম।

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে Delete Button-এ Click করলাম।

একটা Story হারিয়ে গেল।

আরেকটা।

তারপর আরও একটা।

Screen থেকে একের পর এক গল্প মুছে যেতে লাগল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বুকের ভেতরটা ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল।

এই গল্পগুলো খারাপ ছিল না।

কিন্তু এগুলো লিখেছিল এমন এক ছেলে, যে তখনও পৃথিবীকে চিনতে শেখেনি। যার কাছে জীবন মানেই ছিল রঙিন স্বপ্ন, অসম্ভবকে সম্ভব ভাবার সাহস, আর অদম্য কল্পনা।

আজ এত বছর পরে সেই ছেলেটার সঙ্গে আমার আর খুব একটা মিল নেই।

জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।

কিছু স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে।

আবার কিছু নতুন স্বপ্নও দিয়েছে।

তাই মনে হলো, নতুন করে শুরু করতে হলে পুরোনো আমিটাকে সম্মান জানিয়ে বিদায় জানানো দরকার।

শেষ Story-টাও Delete হয়ে গেল।

Website-টা একেবারে ফাঁকা।

যেন নতুন একটা খাতা।

আমি Laptop-টা বন্ধ করলাম না। শুধু চুপচাপ Screen-এর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

কত বছর কেটে গেছে?

দশ?

বারো?

হয়তো আরও বেশি।

হঠাৎ করেই মনটা সময়ের স্রোত বেয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল...

অনেক দূরে...

সেই ছোট্ট শহরে...

সেই ছোট্ট বাড়িতে...


আমাদের পরিবারটা ছিল খুব সাধারণ একটা বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবার।

বাবা একটা ছোট ব্যবসা সামলাতেন। সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাত করে ফিরতেন। দিনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটত হিসাব-নিকাশ, বাজারদর আর সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যে।

মা ছিলেন আমাদের বাড়ির আসল শক্তি।

সংসার সামলানো থেকে শুরু করে আমাদের হাসি-কান্না—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনিই।

আমাদের বাড়িতে অর্থের প্রাচুর্য কোনোদিন ছিল না।

কিন্তু ভালোবাসার অভাবও ছিল না।

মাসের শেষদিকে বাবাকে প্রায়ই পুরোনো হিসাবের খাতা নিয়ে বসতে দেখতাম।

কোথায় কত খরচ হলো...

কোথায় একটু কমানো যায়...

আগামী মাসটা কীভাবে সামলানো যাবে...

ছোটবেলায় এসবের কিছুই বুঝতাম না।

শুধু বুঝতাম, বাবা মাঝে মাঝে খুব চুপচাপ হয়ে যান।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমি যখনই নতুন কোনো বইয়ের আবদার করতাম, বাবা কখনও সরাসরি 'না' বলতেন না।

হয়তো নিজের নতুন শার্ট কেনাটা পিছিয়ে দিতেন।

হয়তো অন্য কোনো দরকারি খরচ কমিয়ে দিতেন।

তবু কয়েকদিন পরে বইটা ঠিক আমার হাতেই এসে পৌঁছাত।

আজ বড় হয়ে বুঝি...

সেটা শুধু একটা বই ছিল না।

ওটা ছিল একজন বাবার নিঃশব্দ ভালোবাসা।

মা প্রায়ই একটা কথা বলতেন—

"যেটা মন থেকে ভালোবাসিস, সেটা মন দিয়েই কর।"

ছোটবেলায় কথাটার গভীরতা বুঝিনি।

আজ বুঝি...

কিছু কিছু বাক্য মানুষের জীবন বদলে দেয়।


আমার ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল বই।

স্কুলের Library...

বন্ধুর কাছ থেকে ধার করা Novel...

Book Fair থেকে কেনা সস্তার Paperback...

পুরোনো বইয়ের দোকানে ধুলো জমা গল্প...

হাতে যা পেতাম, পড়তাম।

একেকটা বই শেষ হওয়ার পর মনে হতো, খুব কাছের একজন মানুষ যেন হঠাৎ বিদায় নিয়ে চলে গেল।

গল্পের চরিত্রগুলো আমার কাছে কাগজের মানুষ ছিল না।

ওরা বেঁচে থাকত।

হাসত।

কাঁদত।

আমার সঙ্গে পথ চলত।

তবু তখনও কোনোদিন ভাবিনি, আমিও একদিন লিখব।

আমি শুধু একজন Reader ছিলাম।

তার বেশি কিছু নয়।


তারপর এল সেই দিনটা...

যে দিনটা না এলে হয়তো আজও আমি কোনোদিন কলম হাতে নিতাম না।

সেদিন বিকেলে Television-এ একটা Hindi Movie চলছিল।

2 States

প্রথমে স্রেফ সময় কাটানোর জন্য বসেছিলাম।

কিন্তু Story যত এগোতে লাগল, আমি ততটাই ডুবে গেলাম।

Movie শেষ হওয়ার পরও অনেকক্ষণ নড়তে পারিনি।

তারপর জানতে পারলাম—

এই সিনেমাটা আসলে একজন লেখকের লেখা Novel থেকে তৈরি।

Chetan Bhagat।

সেদিন আমার মাথার ভেতর প্রথমবার একটা প্রশ্ন জন্মেছিল—

"একজন সাধারণ মানুষ কি সত্যিই একটা গল্প লিখে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে?"

প্রশ্নটার উত্তর তখন জানতাম না।

কিন্তু সেই রাতেই মনে প্রথম একটা স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল।


সময় গড়াল।

আমি তখন Class 10-এ পড়ি।

বয়সটা এমন, যখন মানুষ নিজের ভেতরের নতুন একটা পৃথিবীকে চিনতে শুরু করে।

ঠিক সেই সময়েই আমার জীবনে একসঙ্গে দুটো ঘটনা ঘটল।

প্রথমটা...

আমি প্রথম গল্প লিখলাম।

দ্বিতীয়টা...

আমি প্রথমবার ভালোবাসতে শিখলাম।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, দুটো অনুভূতিই ছিল একেবারে নতুন।

একটা আমাকে শিখিয়েছিল কল্পনার জগৎ তৈরি করতে।

আরেকটা শিখিয়েছিল হৃদয়ের ভাষা।

প্রথম গল্পটা লিখেছিলাম একটা পুরোনো খাতায়।

আজ যদি সেই লেখা পড়ি, হয়তো নিজেই হেসে ফেলব।

ভাষা কাঁচা।

গল্প এলোমেলো।

চরিত্রগুলোও খুব সাধারণ।

কিন্তু সেই গল্পের প্রতিটা লাইনে একটা জিনিস ছিল—

বিশ্বাস।

আমি লিখতে চাই।

আমি গল্প বলতে চাই।

সেদিন বুঝিনি, সেই কাঁচা খাতাটাই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে।


দিনের বেলা School।

বিকেলে পড়াশোনা।

আর রাতে...

সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি চুপচাপ খাতাটা খুলে বসতাম।

কখনও ভূতের Story...

কখনও Mystery...

কখনও Romance...

আবার কখনও এমন সব Character, যাদের অস্তিত্ব শুধু আমার কল্পনাতেই ছিল।

ধীরে ধীরে একটা খাতা ভরে গেল।

তারপর আরেকটা।

তারপর আরও একটা।

কিন্তু একটা সমস্যার জন্য কাউকে কোনোদিন পড়তে দিইনি।

ভয়।

যদি সবাই হাসে?

যদি বলে—

"এগুলোও আবার গল্প?"

সেই ভয়টাই আমার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছিল।

তাই গল্পগুলো মানুষের চোখের আড়ালে রয়ে গেল।

শুধু আমি আর আমার ডায়রি...

আমরাই জানতাম, পাতার পর পাতা জুড়ে কতগুলো স্বপ্ন নিঃশব্দে বড় হয়ে উঠছে।

পাতার পর পাতা গল্পে ভরে উঠছিল আমার ডায়রি। কিন্তু সেই গল্পগুলো পড়ার মতো মানুষ ছিল মাত্র একজন—আমি নিজে।

আমি জানতাম না, আর কয়েক মাসের মধ্যেই সেই গল্পগুলোর একটা প্রথমবারের মতো ডায়রির গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের সামনে আসবে।


Class 11।

নতুন Session শুরু হয়েছে সবে।

একদিন Morning Assembly শেষ হওয়ার পর Head Sir ঘোষণা করলেন, বার্ষিক Wall Magazine প্রকাশ করা হবে। যে যার নিজের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ কিংবা আঁকা ছবি জমা দিতে পারবে।

ঘোষণাটা শুনে পুরো ক্লাসে যেন উৎসব লেগে গেল।

কেউ কবিতা লিখবে।

কেউ Drawing করবে।

কেউ আবার Essay।

আমি চুপচাপ নিজের বেঞ্চে বসে ছিলাম।

মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরছিল—

"আমিও কি একটা Story জমা দেব?"

প্রশ্নটা যত সহজ ছিল, উত্তরটা ততটা নয়।

কারণ, আমার সবচেয়ে বড় শত্রু তখনও সেই পুরোনো ভয়।

যদি কেউ হাসে?

যদি Teacher-রা বলেন, "এসব দিয়ে হবে না"?

যদি বন্ধুরা মজা করে?

সেই রাতে বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ডায়রির পাতা উল্টেপাল্টে দেখলাম।

একটা গল্প বেছে নিলাম।

তারপর নতুন করে পুরোটা লিখলাম।

একটা শব্দ বদলালাম।

আরেকটা Paragraph কাটলাম।

আবার লিখলাম।

মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ Exam-এর Preparation নিচ্ছি।

পরদিন কাগজটা হাতে নিয়ে স্কুলে গেলাম।

Teacher-এর টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত কাঁপছিল।

কাগজটা জমা দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

বাইরে এসে মনে হলো, বুকের ভেতর থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল।

কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকল না।

শুরু হলো অপেক্ষা।

দিন কেটে গেল।

এক সপ্তাহ।

দুই সপ্তাহ।

তারপর এল সেই দিন...

যেদিন Wall Magazine সবার সামনে টাঙানো হবে।


School-এর Corridor-এ সেদিন উপচে পড়া ভিড়।

সবাই নিজেদের লেখা খুঁজছে।

আমি ইচ্ছে করেই একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

হৃদস্পন্দন যেন কানে শোনা যাচ্ছে।

হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে একটা চেনা গলা ভেসে এল—

"এই তন্ময়! তাড়াতাড়ি আয়!"

আমি দৌড়ে গেলাম।

বন্ধুটা হাসতে হাসতে Wall Magazine-এর একটা কোণের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল—

"দেখ... ওটা তোর নাম!"

আমি তাকিয়ে রইলাম।

সাদা কাগজের ওপর কালো অক্ষরে লেখা—

— তন্ময় রায়।

নিচে আমার গল্প।

সেই মুহূর্তে ঠিক কী অনুভব করেছিলাম, আজও ভাষায় বোঝাতে পারব না।

মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কারটা বুঝি পেয়ে গেছি।

Teacher-রা গল্পটা পড়ে প্রশংসা করলেন।

বন্ধুরা এসে বলল—

"ভালো লিখেছিস।"

মাত্র দুটো শব্দ।

কিন্তু সেই দুটো শব্দই আমার আত্মবিশ্বাসের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।

সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ কিছু বলিনি।

শুধু নিজের মনে একটা কথাই বারবার বলছিলাম—

"হয়তো... আমি সত্যিই লিখতে পারি।"


সেই একটা ঘটনা আমার ভেতরে নতুন একটা আগুন জ্বালিয়ে দিল।

এরপর সুযোগ পেলেই লিখতাম।

ছোট ছোট Magazine-এ লেখা পাঠাতাম।

Newspaper-এর সাহিত্য পাতায় Email করতাম।

Online Magazine-এ Story Submit করতাম।

প্রতিবার মনে হতো—

"হয়তো এবার Reply আসবে।"

কিন্তু আসত না।

দিন কেটে যেত।

Inbox ফাঁকাই থাকত।

প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো।

প্রতিটা Rejection যেন নিজের ওপর বিশ্বাসটা একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছিল।

তবু একটা জেদ ছিল।

কেউ না কেউ একদিন পড়বেই।

এই বিশ্বাসটাই আমাকে লিখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।


এরই মধ্যে জীবন নিঃশব্দে আরেকটা মোড় নিল।

কলেজে ভর্তি হলাম।

নতুন Campus।

নতুন বন্ধু।

নতুন স্বাধীনতা।

আর...

প্রথম প্রেম।

Class 10-এ যে অনুভূতিটা নিঃশব্দে শুরু হয়েছিল, কলেজে এসে সেটা আরও গভীর হয়ে উঠল।

Phone Call...

Late Night Chat...

অকারণ হাসি...

ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারটা স্বপ্ন...

সেই সময়টায় মনে হতো, জীবন যেন গল্পের চেয়েও সুন্দর।

আর ঠিক তখনই বুঝতে না বুঝতেই গল্পগুলো আমার জীবন থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল।

আগে রাতে ডায়রি খুলতাম।

এখন Mobile Screen খুলতাম।

আগে Bus-এর জানালার বাইরে তাকিয়ে নতুন Plot ভাবতাম।

এখন Social Media Scroll করতাম।

আগে Character-দের সঙ্গে কথা বলতাম।

এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলতাম।

পরিবর্তনটা খুব ধীরে এসেছিল।

এতটাই ধীরে, যে আমি টেরই পাইনি...

কখন লেখক তন্ময়টা নিঃশব্দে হারিয়ে গেল।


College শেষ হতে না হতেই শুরু হলো বাস্তব জীবন।

চাকরির প্রস্তুতি।

Interview।

ব্যর্থতা।

আবার চেষ্টা।

তারপর অবশেষে একটা Job।

সকালের Alarm...

দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়া...

দিনভর Office...

Deadline...

Target...

Meeting...

Excel Sheet...

Report...

তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরা।

দিনগুলো যেন Copy-Paste হতে লাগল।

একদিন...

দুইদিন...

এক মাস...

এক বছর...

কখন যেন আমার ডায়রিগুলো আলমারির ভেতর ধুলো জমতে শুরু করল।

কলমের কালি শুকিয়ে গেল।

আর আমার ভেতরের লেখকটাও।


তবু...

পুরোপুরি নয়।

মাঝেমধ্যে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যেত।

ছাদের দিকে তাকিয়ে মনে হতো—

"আমি কি সত্যিই এটাই হতে চেয়েছিলাম?"

প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে পেতাম না।

কিন্তু একটা শূন্যতা প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হতে থাকল।

ঠিক সেই সময়েই একটা ছোট্ট আইডিয়া মাথায় এল।

যদি নতুন গল্প লিখতে না পারি...

তাহলে পুরোনো গল্পগুলোকে নতুনভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিই?

সেখান থেকেই শুরু হলো একটা ছোট YouTube Channel।

নিজের গল্প নিজেই Voice-over করতাম।

Office থেকে ফিরে Recording।

তারপর Editing।

Thumbnail Design।

রাত জেগে Upload।

প্রথম Video-তে View ছিল মাত্র কয়েকজন।

দ্বিতীয়টায়ও খুব বেশি নয়।

তবু আশ্চর্যের বিষয়...

আমি আবার আনন্দ পেতে শুরু করেছিলাম।

অনেকদিন পর গল্পগুলো আবার নিঃশ্বাস নিচ্ছিল।

হয়তো অন্য একটা মাধ্যমে।

কিন্তু বেঁচে ছিল।

আমি তখনও জানতাম না...

আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা এখনও শোনা বাকি।


এক বিকেলে Office-এ কাজ করতে করতে একজন Senior Manager হঠাৎ আমাকে বললেন—

"তন্ময়, তোমার কি Writing-এর শখ ছিল কোনোদিন?"

আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শুধু মাথা নাড়লাম।

তিনি হেসে বললেন—

"তাহলে আবার শুরু করো না কেন?"

সেদিন কথাটা শুনে শুধু হেসেছিলাম।

কিন্তু সেই একটিমাত্র বাক্য...

আমার বহু বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নটাকে নীরবে জাগিয়ে তুলতে শুরু করেছিল।

সেই রাতেই আমি আলমারির সামনে দাঁড়ালাম।

বহু বছর ধরে না-খোলা একটা পুরোনো ডায়রি যেন নীরবে আমার অপেক্ষায় ছিল।

ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে ডায়রিটা হাতে নিলাম। পাতাগুলো হলদেটে হয়ে গেছে। কোথাও কালি ফিকে, কোথাও আবার তাড়াহুড়ো করে লেখা দু-একটা লাইন।

ধীরে ধীরে পাতা ওল্টাতে শুরু করলাম।

প্রথম গল্প...

দ্বিতীয় গল্প...

কিছু অসমাপ্ত Plot...

কিছু Character-এর নাম...

আর কিছু স্বপ্ন, যেগুলো কোনোদিন শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি।

একটা পাতায় চোখ আটকে গেল।

গল্পটা মাঝপথে থেমে আছে। নিচে শুধু একটা লাইন—

"শেষটা পরে লিখব..."

লাইনটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম।

মনে হলো, গল্পটা নয়—আমি নিজেই যেন মাঝপথে থেমে গিয়েছিলাম।

সেই রাতেই বুঝলাম, আমার ভেতরের লেখকটা কোনোদিন হারিয়ে যায়নি।

সে শুধু অপেক্ষা করছিল।

আমার জন্য।


এরপর থেকে সুযোগ পেলেই আবার লিখতে শুরু করলাম।

দিনে কাজ।

রাতে Writing।

ছুটির দিনে পুরোনো ডায়রি।

কখনও একটা Character বদলাতাম।

কখনও পুরো Ending।

আবার কখনও মনে হতো, এই গল্পটা নতুন করে লেখাই ভালো।

জীবন আমাকে এতদিনে অনেক কিছু শিখিয়েছে।

সেই অভিজ্ঞতাগুলোই ধীরে ধীরে আমার লেখার ভেতর ঢুকে পড়তে লাগল।


এর কিছুদিন পরে পুরোনো Gmail Account ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ আমার বহু বছরের পুরোনো Website-টা খুঁজে পেলাম।

অনেক চেষ্টা করে Login করলাম।

একটা একটা করে পুরোনো লেখা পড়তে শুরু করলাম।

কোথাও নিজের কাঁচামি দেখে হেসে ফেললাম।

কোথাও আবার মনে হলো, একটু যত্ন নিলে গল্পটা আরও ভালো হতে পারত।

সেদিন একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।

সবকিছু নতুন করে শুরু করব।

শূন্য থেকে।

পুরোনো লেখাগুলোকে নতুন করে লিখতে শুরু করলাম।

যেখানে ভাষা দুর্বল ছিল, সেখানে ভাষা পাল্টালাম।

যেখানে Character অসম্পূর্ণ ছিল, সেখানে তাকে নতুন জীবন দিলাম।

যেখানে Ending তাড়াহুড়ো করে লেখা ছিল, সেখানে সময় নিয়ে নতুন সমাপ্তি লিখলাম।


প্রথম Story আবার Website-এ Publish করলাম।

তারপর দ্বিতীয়টা।

তারপর তৃতীয়টা।

শুরুতে Reader ছিল খুব কম।

কিন্তু ধীরে ধীরে অচেনা কিছু মানুষ আমার লেখা পড়তে শুরু করলেন।

কেউ Comment করলেন।

কেউ Message পাঠালেন।

কেউ আবার লিখলেন—

"আপনার পরের গল্পটার অপেক্ষায় আছি।"

এই ছোট ছোট কথাগুলোই আমাকে আবার বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল।

লেখার মূল্য সবসময় সংখ্যায় মাপা যায় না।

অনেক সময় একজন পাঠকের আন্তরিক অনুভূতিই শত শত প্রশংসার চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।


দিন গড়াতে লাগল।

গল্পের সংখ্যাও বাড়তে লাগল।

আর সেই সঙ্গে বড় হতে লাগল বহু বছরের একটা স্বপ্ন।

অবশেষে একদিন আমি আমার প্রথম বাংলা উপন্যাস 'তুমি ডানা মেলো' pothi.com-এর মাধ্যমে Self Publishing করলাম। ওটা ছিল Print-on-Demand সংস্করণ।

বইটা প্রকাশের পর মনে হয়েছিল, এতদিনের স্বপ্নটা অবশেষে বাস্তবের মাটিতে প্রথম পা রাখল।

হ্যাঁ, একটা সত্যি কথা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই।

আজও আমার বইটির একটি কপিও বিক্রি হয়নি।

প্রথম Sale-এর Notification এখনও আমার কাছে আসেনি।

অনেকের কাছে হয়তো এটা ব্যর্থতা।

কিন্তু আমার কাছে নয়।

কারণ আমি এখন জানি, একটা বই প্রকাশ করাই শেষ গন্তব্য নয়। বরং সেটাই একজন লেখকের নতুন পথচলার শুরু।

একটা সময় ছিল, যখন আমি ভাবতাম সব শেষ হয়ে গেছে। আজ আমি অন্তত সেই জায়গায় নেই। আজ আমি আবার লিখছি।

আমি জানি না আমার প্রথম বই কবে প্রথম পাঠকের কাছে পৌঁছাবে।

আমি জানি না কবে প্রথম Sale হবে।

হয়তো আগামীকাল।

হয়তো কয়েক মাস পরে।

হয়তো আরও অনেক দেরিতে।

কিন্তু আমি অপেক্ষা করতে রাজি আছি।

কারণ, আজ আমার সমস্ত মনোযোগ শুধু প্রথম বইয়ের ওপর নয়।

আমি ইতিমধ্যেই আমার পরবর্তী বইয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছি।

প্রতিদিন একটু একটু করে লিখছি।

শিখছি।

নিজেকে আগের দিনের চেয়ে আরও ভালো লেখক বানানোর চেষ্টা করছি।

এরপর আরেকটা ছোট্ট স্বপ্ন পূরণ করলাম।

নিজের লেখালেখির জন্য একটা স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করলাম—নিজস্ব একটি Website। সেখানে আমার গল্প আছে, আমার বই আছে, আর আছে একজন লেখক হিসেবে আমার পথচলার প্রতিটি ছোট্ট পদচিহ্ন।

আজও মাঝেমধ্যে গভীর রাতে Laptop খুলে বসি।

কখনও নতুন Chapter লিখি।

কখনও পুরোনো Draft Edit করি।

আবার কখনও শুধু ফাঁকা Screen-এর দিকে তাকিয়ে থাকি।

তবে একটা জিনিস বদলে গেছে।

এখন আর আমি নিজেকে খুঁজে বেড়াই না।

আমি জানি, আমি কোথায় ফিরেছি।

হয়তো সামনে আরও অনেক প্রত্যাখ্যান অপেক্ষা করছে।

হয়তো আমার পরের বইও খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

তবু আজ একটা ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ।

আমি আর থামব না।

কারণ আমি বুঝে গেছি, একজন লেখকের পরিচয় তার বই কত কপি বিক্রি হয়েছে, সেটা দিয়ে নয়; বরং কতবার ব্যর্থতার পরেও সে আবার কলম তুলে নিয়েছে, সেটা দিয়েই তৈরি হয়।

স্বপ্ন কখনও মরে না।

তারা শুধু সময়ের অপেক্ষা করে।

আর যে মানুষটা অপেক্ষা করতে জানে, লড়াই চালিয়ে যেতে জানে, একদিন না একদিন সেই স্বপ্নও তার দরজায় কড়া নাড়ে।

হয়তো আমার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টা এখনও লেখা বাকি।

আর সেই কারণেই...

আমি এখনও লিখে চলেছি।

📖 তুমি ডানা মেলো

তুমি ডানা মেলো

‘তুমি ডানা মেলো’ আমার প্রথম বাংলা উপন্যাস। এটি pothi.com-এর মাধ্যমে Self Publishing করা হয়েছে এবং Print-on-Demand সংস্করণে উপলব্ধ। যদি আপনি এমন গল্প পড়তে ভালোবাসেন, যেখানে স্বপ্ন, আবেগ, ভালোবাসা এবং বাস্তব জীবনের লড়াই একসঙ্গে মিশে থাকে, তাহলে বইটি আপনার জন্য।

📚 বইটি পড়ুন


✍️ লেখক পরিচিতি

আমি তন্ময় রায়। বাংলা ভাষায় গল্প ও উপন্যাস লিখতে ভালোবাসি। আমার লেখালেখির সমস্ত আপডেট, নতুন গল্প, বই এবং অন্যান্য তথ্য জানতে ভিজিট করুন আমার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।

🌐 Visit My Website


📱 Social Media

আমার সঙ্গে যুক্ত থাকুন—

📘 Facebook 📷 Instagram


❤️ আপনার একটি Review, Comment বা Share-ই আমার পরবর্তী বই লেখার অনুপ্রেরণা।

ভালো লাগলে বইটি আপনার বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না।